শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ইতিহাস, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার পুরনো নীতি। দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অতীতে ভারতে আশ্রয় পেয়েছেন। দেখে নেওয়া যাক, কারা তাঁরা?
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে দেশছাড়া মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম তিব্বতের ধর্মগুরু দলাই লামা। ১৯৫৯ সালে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর দলাই লামা ভারতে চলে আসেন। ভারত তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়। তাঁর ভারতে অবস্থান নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও দীর্ঘদিন টানাপোড়েন চলছে।
দলাই লামা পরবর্তী সময়ে ধর্মশালাকে তাঁর নির্বাসিত জীবনের কেন্দ্র করে তোলেন। তাঁর সঙ্গে হাজার হাজার তিব্বতি ভারতে বসবাস শুরু করেন। ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি অবশ্যই একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে থেকেছে, কিন্তু তাঁর আশ্রয়কে কেন্দ্র করে ভারতের সামনে শেখ হাসিনার মতো প্রত্যর্পণের সরাসরি আইনি চাপ তৈরি হয়নি।
ভারতের আশ্রয় দেওয়ার আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা শ্রীলঙ্কার তামিল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বরদরাজা পেরুমাল ভারতে আশ্রয় নেন। তিনি শ্রীলঙ্কার তামিল অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য আরও বেশি স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়। ভারত তাঁকে দেশছাড়া করেনি। বরং তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তাঁকে ভারতে থাকতে দেয়।
পেরুমালের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। শ্রীলঙ্কা সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের উপর তেমন চাপ তৈরি করেনি। ফলে দিল্লির সামনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বনাম প্রত্যর্পণের মতো জটিল প্রশ্ন তৈরি হয়নি।
হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রায় ১৫ বছর। তাঁর দীর্ঘ শাসনকালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সহযোগিতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। ফলে শেখ হাসিনার পতনে ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সমীকরণও বদলে গেল।
দলাই লামা তিব্বতের প্রশাসনিক ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে এসেছিলেন। পেরুমালও নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পর নিরাপত্তার জন্য দেশ ছাড়েন। কিন্তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ তিনি এমন একজন নেতা যাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার সরাসরি যোগ ছিল এবং যাঁর বিরুদ্ধে নতুন সরকার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অভিযোগে মামলা করে। শেখ হাসিনার আমলে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও পরে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকার কাছে শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকা একজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তির কাছে তিনি একজন অভিযুক্ত এবং দেশে ফেরানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
এই কারণেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও জানিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে ওই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া হবে।
ভারতের জন্য সমস্যাটা এখানেই। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও কৌশলগত সম্পর্ক। অন্যদিকে রয়েছে একজন প্রাক্তন সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন। তাঁকে ফেরত পাঠালে তাঁর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার তাঁকে ভারতে রেখে দিলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ব্যক্তিগত দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস বহু দশকের। ১৯৭৫ সালে তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যার শিকার হওয়ার সময় হাসিনা দেশের বাইরে ছিলেন। পরে তিনি ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক মহলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন।
প্রসঙ্গত, এই দ্বন্দ্ব ২০২৬ সালেও পুরোপুরি কাটেনি; বরং শেখ হাসিনার দিল্লিতে প্রকাশ্য বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাঁর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে এবং তাঁর প্রত্যর্পণের দাবিও আবার সামনে এসেছে। ভারত অবশ্য তাঁর ওই বক্তব্যের আয়োজন বা সমর্থনের সঙ্গে নিজেকে সরাসরি যুক্ত করেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ওই আয়োজন শুরুর আগেই ওই বিষয়ে আমরা আমাদের মতামত স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম। আরও একবার বলেছি। আয়োজনটি ছিল একটি বেসরকারি মিডিয়া সংস্থার উদ্যোগ। তাতে সরকারের কোনো ভূমিকাই ছিল না। ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, তার কোনো কিছুই ভারত অনুমোদন বা সমর্থন করে না।
ভারতের ইতিহাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের নজির নতুন নয়। দালাই লামা কিংবা পেরুমালের মতো ব্যক্তিরা ভারতে আশ্রয় পেয়েছেন এবং দীর্ঘদিন থেকেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ভারতকে এমন একজন প্রাক্তন সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সামলাতে হচ্ছে, যাঁকে তাঁর নিজের দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাইছে এবং যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে।
এই কারণেই শেখ হাসিনার নির্বাসন ভারতের কাছে একেবারেই নতুন ধরনের পরীক্ষা। তাঁকে আশ্রয় দেওয়া যতটা মানবিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তাঁকে কতদিন এবং কোন শর্তে ভারতে রাখা হবে, কিংবা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, সেটি তার চেয়েও বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অনেকটা নির্ধারণ করতে পারে।
(ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া)