Image description

ভারতের রাজনীতিতে ফের বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়েছে। দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর দল। ভোটের ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় তার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের জোট গঠনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখন বলেছিলেন, মোদীর অজেয় ভাবমূর্তির আভা ফিকে হয়ে গেছে। তবে এর কিছুদিন পরেই রাজ্য নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ায় বিজেপি। বিরোধীদের সহজে পরাস্ত করে তারা। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মোদীর সমালোচকদের মুখে আবারও একই সুর শোনা যাচ্ছে।

সম্প্রতি দিল্লিসহ ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনে ব্যাপক চাপে পড়ে মোদী সরকার। আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় গত ২৫ জুলাই। সেদিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। মোদী জমানায় গত তিন বছরে দু’বার মেডিকেল কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা বিতর্কিত হয়েছে।

 

কোনো গণতান্ত্রিক দেশে চরম অদক্ষতার দায়ে মন্ত্রীর পদত্যাগ স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু মোদী সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত বিরল। ১২ বছরের শাসনামলে এই প্রথম মোদী সরকারের কোনো মন্ত্রীকে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করতে হলো। নির্বাচনের মাঠে জেতা আর এই ধরনের সংকট সামাল দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

ক্ষতিপূরণ ও আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা

নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, তিনি একজন সংবেদনশীল নেতা। তিনি উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ আমলাকে বদলি করেছেন। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার ৪৭ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সরকার প্রশ্ন ফাঁসকারীদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি বিল এনেছে।

এই অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের কথা বলা হয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

তবে তাৎক্ষণিক এই পদক্ষেপগুলো ছাড়া সরকারের গভীরে আত্মসমালোচনার লক্ষণ নেই। বিক্ষোভকারীদের দমনের নীতি থেকে তারা সরে আসেনি। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ভুল স্বীকার না করার পুরোনো নীতিতেই অনড় রয়েছে সরকার।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র ও বিতর্ক

পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নেননি। তিনি নিজেকে বাইরের শক্তির অসহায় শিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার দাবি, কিছু অসাধু চক্র পরীক্ষা ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করেছে এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে।

পরে পার্লামেন্টেও ধর্মেন্দ্র প্রধান দাবি করেন, বিষয়টি অতটা বড় নয়। ঘটনার দুই দিন পর পার্লামেন্ট ভবনে সাবেক এই মন্ত্রীকে বীরের মতো অভ্যর্থনা জানান মিত্ররা।

ব্যবস্থা নেওয়ার নামে দায়সারা মনোভাব

পরীক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করার ব্যাপারে মোদীর পরিকল্পনাও যেন কেবল লোকদেখানো। সম্প্রতি গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স আসলে ২০২৪ সালের উচ্চ পর্যায়ের কমিটিরই আরেকটি রূপ। কঠোর শাস্তির প্রতিশ্রুতির বিলটি ২০২৪ সালের আইনেরই নতুন সংস্করণ।

এর মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ভোক্তা বিষয়ক এবং খাদ্য দপ্তরের দায়িত্বে রয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো দায়িত্ব সামলানোর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, এটি সরকারের কাছে কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বাকস্বাধীনতা হরণে কড়াকড়ি

বাকস্বাধীনতা দমনের ক্ষেত্রে মোদীর দল সবসময় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত মে মাসে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছিল। মধ্য দিল্লির প্রতিবাদস্থলের আশপাশে বেশ কয়েকদিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। একটি পিটুপি মেসেজিং অ্যাপও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মোদীবিরোধী পোস্ট মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমগুলোকে। সরকারি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মূল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে বৈঠকও করেছে সংসদীয় কমিটি।

ইনস্টাগ্রামে মোদীর রিল ও জেন জি ভাষা

মোদী সরকারের এই কৌশলে একটি নতুন দিকও দেখা যাচ্ছে। আন্দোলন দানা বাঁধার মূল মাধ্যম ছিল ইনস্টাগ্রাম। এটি বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

গত ২৩ জুলাই মোদি এই প্ল্যাটফর্মে তার প্রথম রিল বা সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রল ও হাস্যরস শুরু হয়।

অন্যদিকে সরকারের অনুগত গণমাধ্যমগুলো দাবি করে, ভিডিওটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ভিউয়ের রেকর্ড গড়েছে।

মন্ত্রীদেরও এই প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মোদী। এমনকি এক সংসদ সদস্যকে পার্লামেন্টে তরুণ প্রজন্মের ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য দাঁড় করানো হয়।

তরুণদের ভাষায় একে বলা হয় ‘অরা ফার্মিং’ বা ভাব বজায় রাখার কৃত্রিম চেষ্টা। এর মধ্য দিয়ে আদতে কোনো ভাব বা আকর্ষণই ধরে রাখা যায় না।

সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেই সংকট কাটবে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর সংস্কার দরকার।

এখন দেখার বিষয়, এই সংকট সামলে নরেন্দ্র মোদী আবারও তার আগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট