নাতালি তোকচি
যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া কিংবা তাদের খুব সামান্য সহায়তা নিয়ে ইউরোপ কীভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করবে? এই প্রশ্নটি বর্তমানে ইউরোপ মহাদেশের সামনে থাকা অস্তিত্ব সংকটের মূল রূপরেখা তুলে ধরে।
রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা ইউক্রেন দিয়ে শুরু হলেও সেখানেই শেষ নয়। মস্কোর হাইব্রিড হামলা, রাশিয়া-বান্ধব দলগুলোর সমর্থনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং তাদের সামরিক ক্ষমতার আস্ফালন—যার মধ্যে যুক্তরাজ্যের উপকূল থেকে মাত্র ৪৫ মাইল দূরে একটি রুশ যুদ্ধজাহাজের তাজা বুলেট নিক্ষেপের মহড়াও রয়েছে—সবই একই দিকে ইঙ্গিত করে।
আগামী মাস বা বছরগুলোতে রাশিয়ার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে একটি সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণেই পুরো ইউরোপজুড়ে, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকা দেশগুলোতে সামরিক বাজেট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। তবে এটি ট্রাম্পের উপহাস ও কটূক্তির কারণে ততটা হয়নি, যতটা হয়েছে ইউরোপীয়দের এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কারণে যে—রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের পাশে থাকবে না।
যদিও মার্কিন পারমাণবিক সুরক্ষা কবচ শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে—যদিও ফ্রান্স ইতিমধ্যে তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায় তাদের নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ইউরোপীয়করণ করার উদ্যোগ নিয়েছে—ইউরোপীয় সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই আশঙ্কার হিসাব কষছে যে, মার্কিন প্রথাগত বাহিনীর সমর্থন ছাড়াই অথবা তাদের খুব সামান্য সাহায্য নিয়ে হয়তো রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হতে পারে।
আর এটিই বর্তমানে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘ন্যাটো ৩.০’ নামে পরিচিত ব্যবস্থার উত্থানের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে। কয়েক সপ্তাহ আগে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে এই উদ্যোগটি বেশ সাড়ম্বরে প্রচার করা হয়েছিল—আংশিকভাবে ট্রাম্পকে শান্ত করতে এবং আংশিকভাবে ভ্লাদিমির পুতিনকে এই বার্তা দিতে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষ্ক্রিয় হয়েও পড়ে, তবুও একটি ইউরোপীয়করণ করা ন্যাটো নির্ভরযোগ্য থাকবে।
এর সমর্থকরা যে স্লোগানটি ব্যবহার করেন—‘একটি শক্তিশালী ন্যাটোতে আরও শক্তিশালী ইউরোপ’—তা বিভ্রান্তিকর। হ্যাঁ, ইউরোপীয়রা সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে সামগ্রিকভাবে ন্যাটো দুর্বল হয়ে পড়বে। তবুও ইউরোপীয়করণ করা ন্যাটোর লক্ষ্যে কাজ করা বুদ্ধিমানের কাজ; কারণ জোটটি সামগ্রিক অর্থে দুর্বল হলেও আগ্রাসী রাশিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী থাকতে পারে।
তবে এখানেই আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং একই সঙ্গে বিকল্পগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আগামী মাস বা বছরগুলোতে রাশিয়ার কোনো ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ করার মতো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হলো। সেক্ষেত্রে ওই দেশটির ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্ররা সম্ভবত তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে।
পূর্ব ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলো অবশ্যই একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। এমনকি জার্মানিও সাংস্কৃতিক ও মানসিকভাবে এই বড় ধাক্কাটি সামলে নিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে যে তাদের সৈন্যদের আবারও রুশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হতে পারে। লিথুয়ানিয়ায় স্থায়ীভাবে ৫ হাজার সদস্যের একটি সামরিক ব্রিগেড মোতায়েন করার জার্মান পরিকল্পনা সেই ইঙ্গিতই দেয়।
জার্মানি যদি সাড়া দেয়, তবে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও সম্ভবত এগিয়ে আসবে। আর এই মূল দেশগুলো যদি এগিয়ে আসে, তবে ইতালি ও স্পেনও তাদের অনুসরণ করবে। ভালো খবর হলো, ইউরোপীয়রা সম্ভবত ঐক্যবদ্ধই থাকবে। কিন্তু খারাপ খবর হলো, ইউরোপকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাড়া না-ও মিলতে পারে—আর এটি ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে ন্যাটো ভেঙে যাবে।
ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা চুক্তির মূল প্রতিশ্রুতি বা ‘অনুচ্ছেদ ৫’ অনুযায়ী, একটি সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সক্রিয় আহ্বানে সাড়া না দিলে অথবা এমন পরিস্থিতির আশঙ্কায় যদি অনুচ্ছেদ ৫ কখনো সক্রিয়ই না করা হয়—উভয় ক্ষেত্রেই জোটটির ভাঙন হবে অবধারিত ও একই ধরনের।
দ্বিতীয় ও তুলনামূলক কম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিটি হলো—যেখানে রাশিয়ার কোনো উসকানি থাকবে না এবং ন্যাটো ৩.০ আন্তরিকভাবে এগিয়ে যাবে। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এই জোটটি আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেবে, যেখানে তুরস্ক ও কানাডার পাশাপাশি ইউরোপীয়রাই সিংহভাগ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্য মিত্ররা যদি দায়িত্বের সিংহভাগ বহন করে, তবে তারা অধিকারেরও সিংহভাগ দাবি করবে।
ফলে ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজার মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং ন্যাটোর অগ্রাধিকারগুলো ইউরোপের স্বার্থকে প্রতিফলিত করতে শুরু করবে। ইউরোপীয়রা কেবল হুকুম তামিল করে অনন্তকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য মেনে নিতে নিশ্চিতভাবেই রাজি হবে না। তবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন তো বটেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রশাসনের পক্ষেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব অধিকার ও সুবিধা ছেড়ে দেওয়া কল্পনা করা কঠিন।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ন্যাটো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ইউরোপীয়রা এত দিন মার্কিন কমান্ড কাঠামোর সঙ্গে একীভূত ছিল এবং মার্কিন যুদ্ধকৌশলকেই নিজেদের করে নিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো সক্ষমতা, জনবল ও কমান্ড কাঠামোর অভাব রয়েছে তাদের। ফলে অদূর ভবিষ্যতে যদি কোনো সশস্ত্র আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে হয়, তবে তারা ন্যাটোর বিদ্যমান মডেলটি হুবহু অনুকরণ করতে পারবে না। তারা যেভাবে হোক বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করবেই—তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক সদস্য হিসেবে বহাল থাকলে (যদিও তাদের প্রতিশ্রুতি কম থাকবে), জোটের ভেতরে থেকে এই বিকল্প গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
বিকল্পগুলোর কোনোটিই আদর্শ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রতিরক্ষা খাতের শিল্পগুলোর সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে এবং এর চুক্তিতে একটি ‘পারস্পরিক সহায়তা ধারা’ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমি বিশ্বাস করি না যে এটি প্রতিরক্ষার জন্য একটি কার্যকর পথ হতে পারে।
এটি তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ (স্বেচ্ছাসেবী জোট)-এর ধারণাটিকে সামনে নিয়ে আসে, যার ইতিহাস বেশ বিতর্কিত হলেও বর্তমানে তা আবার পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। অতীতে জাতিসংঘ বা ন্যাটোর মতো আনুষ্ঠানিক বহুপক্ষীয় কাঠামো এড়াতে চাওয়ার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কোয়ালিশন অব দ্য উইলিংয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এর সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হলো ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন করে করা হয়েছিল।
আজ ইউক্রেন, গ্রিনল্যান্ড ও হরমুজ প্রণালীসহ বেশ কিছু সংবেদনশীল নিরাপত্তা ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং গড়ে উঠছে। অতীতের মতোই, এই জোটগুলো গড়ে ওঠার মূল কারণ হলো বিদ্যমান সংস্থাগুলো (জাতিসংঘ, ন্যাটো ও ইইউ) এককভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে মজার বিষয় হলো, এবারের জোটগুলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন নয় এবং এদের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করাও নয়; বরং এগুলো ইউরোপের নেতৃত্বাধীন, যা ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিষয়ে ইউরোপের সম্মিলিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে।
তবে এই কোয়ালিশন অব দ্য উইলিংগুলো মূলত বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক (অ্যাড-হক) এবং সাময়িক হয়ে থাকে। এগুলোতে রাজনৈতিক-কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা বা সুনির্দিষ্ট কমান্ড চেইন থাকে না।
যদিও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সামরিক বাহিনীগুলো বর্তমানে যৌথ পরিকল্পনা তৈরির জন্য নিয়মিত বৈঠক করছে, তবুও একটি ইউরোপীয় যুদ্ধকৌশলকে কাঠামোগত রূপ দিতে, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি এর ধারাবাহিক আনুগত্য নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ জনগণের মনে সত্যিকারের আস্থা তৈরি করতে যে স্থায়িত্ব প্রয়োজন, তা এই জোটগুলোর নেই। তাই রাজনৈতিক স্তরে এই জোটগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এর একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা। মূলত ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্যকে যুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে এই ধারণাটির জন্ম হয়েছিল। মহাদেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইউরোপীয়রা কীভাবে পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ধারণের জন্যই এখন ধারণাটি পুনরায় সামনে আনা হচ্ছে।
এর কোনোটিই ন্যাটোর ইউরোপীয়করণের গুরুত্বকে খাটো করে না—তবে ন্যাটো ৩.০ যদি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ বা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
লেখক পরিচিতি
তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ইউরোপবিষয়ক একজন নিয়মিত কলাম লেখক। এছাড়া তিনি রোমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টিটিউট অ্যাফেয়ারি ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।