Image description

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ভাঙা কিংবা মসজিদের মধ্যে মন্দিরের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রতিনিয়তই বিদ্বেষ বাড়ছে। দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। সম্প্রতি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার পান্ডুয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদীরা তাদের দাবিকে আরো তীব্র করেছে। তাদের দাবি আদিনা মসজিদ নাকি আদিনাথের প্রাচীন শিবমন্দির—আর এই দাবিকে কেন্দ্র করে মসজিদটির কাছাকাছি এলাকায় শিবপূজা ও রুদ্রাভিষেকের আয়োজন করা হয়েছে।

 

বিজ্ঞাপন

সোমবার প্রায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো এই স্থাপনার ৫০ মিটারের মধ্যে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সেখানে আদিনাথের রুদ্রাভিষেকের (হিন্দু ধর্মে দেবাদিদেব মহাদেবের পবিত্র মন্ত্রপাঠ সহকারে জল ও পঞ্চামৃত দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান করানোর একটি বিশেষ পূজা) আয়োজন করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিজেপির রাজারহাটের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারি আদিনা মসজিদকে আদিনাথ মন্দির হিসেবে দাবি করলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

 

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দর শাহ আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে শিবসহ হিন্দু দেবদেবীর নিদর্শন রয়েছে—এমন দাবি তুলে একাংশের মানুষ এটিকে প্রাচীন আদিনাথ শিবমন্দির বলে দাবি করে আসছেন।

এ নিয়ে বর্তমানে আদালতেও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মসজিদের নিকটবর্তী এলাকায় শিবপূজার আয়োজনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ উপলক্ষে আশপাশের এলাকাও সাজসজ্জা করা হয়েছে।

 

আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজল গোস্বামীর দাবি, স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে আদিনাথ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। তার ভাষ্য, এটি মূলত একটি প্রাচীন শিবমন্দির, যা পরবর্তীতে মসজিদে রূপান্তর করা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও একই ধরনের দাবি করে বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় শিব ও দুর্গার মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। তাই তারা স্থাপনাটিকে মন্দির হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

আদিনাথ শিব মন্দির ও মেলা কমিটির পক্ষ থেকে কাজল গোস্বামী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। আদালতের নির্দেশনা মেনে ভবিষ্যতে শিবলিঙ্গ নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে স্থাপনাটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর অধীনে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, স্তম্ভটিকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের একটি অন্যতম বিষয় হলো এর কিছু ব্যাসল্ট পাথরের দেয়াল ও দরজায় খোদাই করা হিন্দু চিত্রকলার উপস্থিতি।

স্থাপত্য ইতিহাসবিদরা সাধারণত এই খোদাইগুলোকে পূর্ববর্তী কাঠামোর উপকরণ পুনঃব্যবহারের ফল বলে মনে করেন—যা মধ্যযুগীয় নির্মাণে একটি সাধারণ রীতি ছিল—অন্যদিকে পণ্ডিতরা স্মৃতিস্তম্ভটিকে ইসলামি ও দেশীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের সংশ্লেষণ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

 

তবে, পুনঃব্যবহৃত উপকরণগুলোর সঠিক উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

 

নতুন করে আন্দোলন জোরদার হওয়ায় জেলা প্রশাসন স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

 

যদিও হিন্দু সংগঠনটি জানিয়েছে যে এ বছরের আচার-অনুষ্ঠান নিকটবর্তী মন্দিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং স্মৃতিস্তম্ভটির ওপর ভবিষ্যতের যেকোনো দাবি শুধুমাত্র বিচারিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই উত্থাপন করা হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও শতবর্ষী আদিনা মসজিদকে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক বিতর্কিত আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

 

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছে, তাই এই বিবাদটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান জনমতকে প্রভাবিত করে চলেছে।

 

ওই স্থানে প্রস্তাবিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মালদা জেলা পুলিশও একটি জনবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। 

সংবাদপ্রতিবেদন

 

 

বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই স্মৃতিস্তম্ভটি ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও ধ্বংসাবশেষ আইনের অধীনে সুরক্ষিত। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, অনুমতিবিহীন ধর্মীয় কার্যকলাপ আয়োজন বা এই সুরক্ষিত কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনার চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে আদিনাথ শিবমন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে আদিনা মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও মালিকানা নিয়ে বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।