Image description

ভারতের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এখন দেশটির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় শিক্ষার্থী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছেন।

গত সোমবার হাজার হাজার আন্দোলনকারী পূর্বঘোষিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচী ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। এর পর থেকে প্রতিদিনই আরো হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে ফিরে আসছে।

বিজ্ঞাপন

এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন পরিবেশকর্মী ও সংস্কারক সোনাম ওয়াংচুক। তিনি জানান, আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে গিয়ে ২৬ দিনের অনশনে তাঁর ১১ কেজি ওজন কমেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি অনশন ভঙ্গ করলেও আন্দোলনকারী ছাত্র নেতারা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবাদ চলবে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—এটি কি স্রেফ আরেকটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলন, নাকি কোনো বড় পরিবর্তনের সূচনা?

ইতিহাসের দিকে তাকালে সতর্কবার্তা এবং আশাবাদ—উভয় বিষয়ই উঠে আসে।

ভারতে ছাত্র আন্দোলন যুগে যুগে রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে। সত্তর দশকে গুজরাটের ‘নবনির্মাণ আন্দোলন’ প্রবীণ সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের হাত ধরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এনে দিয়েছিল। আবার অনেক আন্দোলন হঠাৎ দাবানলের মতো জ্বলে উঠে ধীরে ধীরে নিভেও গেছে।

তবে সিজেপি আন্দোলনের ব্যতিক্রমী দিকটি কেবল এর বিশাল ব্যাপ্তিতে নয়, বরং এর ক্ষোভের প্রকৃতি ও গভীরতার মধ্যেও রয়েছে।

গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া বড় বড় আন্দোলনগুলোর (যেমন: নাগরিকত্ব আইন বা কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলন) সাথে এর পার্থক্য হলো—এই আন্দোলনটির পেছনে কোনো বিশেষ আদর্শিক ভিত্তি নেই। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সামাজিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্থেও গড়ে ওঠেনি।

বরং, এই আন্দোলনটি সরাসরি একটি ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে: যে সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থাকে দেশের কোটি কোটি তরুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের প্রধান উপায় হিসেবে দেখে, রাষ্ট্র কি সেখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম?

 

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনী আয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা ও শিক্ষা এমন একটি ইস্যু যা জাত, শ্রেণি ও লিঙ্গের বিভাজন অতিক্রম করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই এই আন্দোলনে যোগ দেওয়া মূল অংশটি নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে না।

দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল ভার্মা বলেন, আগের আন্দোলনগুলোর মতো এটি আদর্শগত নয়; বরং সরকারের সুশাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তার মতে, এ কারণে আন্দোলনটি ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

তিনি মনে করেন, এই আন্দোলনের কারণে বিজেপিকে তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। রাহুল আরও যোগ করেন, আন্দোলনে যারা অংশ নিচ্ছেন, তাদের বড় একটি অংশ বিজেপির স্বাভাবিক বিরোধী পক্ষ নয়।

তারা মূলত ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেইসব তরুণ-তরুণী ও তাদের অভিভাবক, যারা এই পরীক্ষাগুলোকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ মনে করেন। যেহেতু এই ক্ষোভটি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে নয় বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে, তাই বিজেপি চাইলেই নিজেদের সমর্থকদের আগের মতো সহজে একাট্টা করতে পারছে না বা পরিচিত রাজনৈতিক বয়ান দিয়ে আন্দোলন দমন করতে পারছে না।

 

গত দুই সপ্তাহ ধরে অনেকে সিজেপির ব্যাপক অনলাইন প্রভাব দেখে ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সাথে তুলনা করছিলেন। তবে সমালোচকরা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এই গতি বাস্তবে রাজপথে তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে সোমবারের জনস্রোত সেই পরিসংখ্যানকে উল্টে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ডিজিটাল আন্দোলন রাজপথেও ঝড় তুলতে পারে।

প্রযুক্তি ও সমাজ নিয়ে গবেষণারত মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়োজিত পাল জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটি অনুকূল পরিবেশ, যা যেকোনো মুহূর্তেই আবেগ থেকে বিস্ফোরিত হতে প্রস্তুত।

তিনি বিবিসিকে বলেন, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার দীর্ঘদিনের অভাব এই ‘বিস্ফোরণের’ জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যে রূপ ও গঠন, তাতে ভবিষ্যতে এ ধরণের আন্দোলন আরও ঘটতে পারে।

এখন দেখার বিষয় হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই জোয়ার সত্যিকারার্থে দীর্ঘমেয়াদী কিছুতে রূপ নিতে পারে কিনা?

রাহুল ভার্মা মনে করেন, ‘সোমবারের সমাবেশ ইঙ্গিত দেয় যে আন্দোলনটি হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করেছে।’ তিনি আরও বলেন, এটি সামনে কতদূর এগোবে তা নির্ভর করছে সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয় তার ওপর।

তবে যামিনী আইয়ারের মতে, সোমবারের প্রতিবাদে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় প্রকাশ্যে এসেছে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন, অন্যান্য ছাত্র ইউনিয়ন এবং ‘ভীম আর্মি’র মতো দলগুলোকে সেখানে দেখা গেলেও, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির কাছে তারা সংখ্যায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল।

যামিনী আইয়ারের বিশ্বাস, আন্দোলনটি এখন তাকে জন্ম দেওয়া মূল সংগঠন সিজেপি এবং সোনাম ওয়াংচুকের অনশন কর্মসূচিকে ছাড়িয়ে আরও বড় আকার ধারণ করেছে।

প্রাথমিকভাবে বিষয়টি মন্ত্রী ও দলীয় মুখপাত্রদের ওপর ছেড়ে দিলেও, বিজেপি-র শীর্ষ নেতৃত্ব শেষমেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ এনে আশ্বাস দেন যে, সরকার সংসদের মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

যামিনী আইয়ারের মতে, এই আন্দোলনটি যুবসমাজের ভেতরের অনেক গভীর শঙ্কাকে সামনে নিয়ে এসেছে—যেমন মন্দা অর্থনীতি, চাকরির অভাব এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অর্জনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।

তিনি বলেন, ‘মানুষের মাঝে গভীর অর্থনৈতিক অসন্তোষ রয়েছে, যা ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরণের হতাশায় পরিণত হয়েছে। এটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারানোর একটি সংকেত হতে পারে। তারা যে প্রতিশ্রুতিগুলোর ওপর ভর করে টিকে ছিল, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় হয়তো সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’

 

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিজ্ঞানী সুহাস পালশিকর মনে করেন, এই আন্দোলন হয়তো মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের একটা সুযোগ হিসেবে কাজ করবে এবং একসময় কৃষক আন্দোলনের মতো আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যাবে।

তিনি এক্সে (টুইটার) লিখেছেন, ‘এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে? হয়তো কোথাও না—এটি সাময়িকভাবে মানুষের মনের ক্ষোভ বের করার জায়গা তৈরি করবে এবং একসময় থিতিয়ে যাবে।’

তিনি এটিকে অন্ধভাবে জেন-জি বা যুব বিপ্লব হিসেবে দেখার বিষয়েও সতর্ক করে দেন। ‘এটিকে কোনো জেন-জি বা যুব আন্দোলন হিসেবে কল্পনা করা ভুল হবে—এগুলো ভাষ্যকারদের দেওয়া সাময়িক আখ্যা মাত্র।’ তিনি মনে করেন, এই আন্দোলনের ‘রাজনৈতিক ও আদর্শিক রূপ এখনো নিশ্চিত নয়’ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এতে নিজস্ব প্রভাব খাটাতে চেষ্টা করবে।

তবে পালশিকর স্বীকার করেছেন যে, রাজপথে নেমে সরকারের সাথে মুখোমুখি হওয়ার সাহসিকতা তরুণরা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে।

অন্যদিকে, দিল্লি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ মজুমদার মনে করেন, এই আন্দোলন স্রেফ প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেয়েও অনেক বড় কিছুর সংকেত দিচ্ছে।

তিনি বিবিসি-কে বলেন, ‘এই প্রতিবাদ এবং এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ভারতের যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে—যা কেবল নির্দিষ্ট পরীক্ষার পেপার লিকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।’

আগের আন্দোলনগুলোর তুলনায় তিনি এই আন্দোলনকে ‘আরও ব্যাপক ও বড় আকারের’ বলে মনে করেন।

সুরজিৎ বলেন, এটি প্রমাণ করে যে ‘ভারতীয় সমাজে গণতান্ত্রিক চেতনা এখনো পুরোপুরি বজায় আছে।’

যামিনী আইয়ারের মতে, সেই গণতান্ত্রিক চেতনাই আজ রাজনীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন নির্বাচনের বাইরেও ভিন্ন উপায়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতা দাবি করছে। ভোটের মাধ্যমে পাওয়া বৈধতা আর ভোটের বাইরে তোলা গণতান্ত্রিক দাবির জবাবদিহিতা—এই দুটির ব্যবধানই এখন ভারতের রাজনীতির নতুন এক বাস্তবতা।’

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই আন্দোলন ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, নাকি স্রেফ একটি ক্ষণস্থায়ী বিক্ষোভের স্মৃতি হয়ে থাকবে—তা কেবল এখন সময়ই বলতে দিবে।