উত্তাল স্লোগান আর বিশাল জনস্রোতের আড়ালে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদী পরিবেশকে সুশৃঙ্খল ও সচল রাখছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভে কেউ কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বেচ্ছাসেবক দলভুক্ত হলেও, অনেকেই নিছক নিজের তাগিদ থেকে আন্দোলনে এসে যেকোনো প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রচণ্ড গরমে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করা, ভিড় নিয়ন্ত্রণে মানবশৃঙ্খল তৈরি, আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদান, প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়ার মতো সমস্ত কাজ নীরবে সামলে নিচ্ছেন তারা।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন লার্নিংয়ের ২১ বছর বয়সি শিক্ষার্থী হর্ষ আগে অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতেও দ্বিধা করতেন। কিন্তু সিজেপির ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রা তার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।
গত সোমবার পুলিশের লাঠিচার্জের সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বলার মধ্য দিয়ে তার এই যাত্রার শুরু। এরপর বুধবার থেকে তিনি রাজস্থান থেকে আসা কোটা কচুরির ব্যাগ হাতে নিয়ে পুরো ভিড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ শুরু করেন। হর্ষ জানান, এখন আর অপরিচিতদের সাথে কথা বলতে তার কোনো সংকোচ কাজ করে না।
কেবল খাবার বণ্টন নয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও এগিয়ে এসেছেন অনেকে। শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতির দাবিতে আন্দোলনের সমর্থনে পাঁচদিনের ছুটি নিয়ে যন্তর মন্তরে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছেন পঞ্চম বর্ষের এক এমবিবিএস ইন্টার্ন চিকিৎসক।
দিল্লির আরও কয়েকজন চিকিৎসকের সহযোগিতায় দিনভর আহত ও অসুস্থ আন্দোলনকারীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার পাশেই রাস্তার ওপর বসে থাকা ক্লান্ত বিক্ষোভকারীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায় ১৬ বছর বয়সি এক স্কুল শিক্ষার্থীকে। নিজের এবং দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার তাগিদ থেকেই সে এই কর্মসূচিতে শামিল হয়েছে বলে জানায়।
প্রতিবাদস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন গুরগাঁওয়ের ৫১ বছর বয়সি গৃহিনী অর্পিতা প্রকাশ। হাতে ময়লার ব্যাগ নিয়ে তিনি ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিকের বোতল ও খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করছেন। গত মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণদের উদ্দেশ্য করে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, যেখানে কর্মসংস্থানহীন তরুণ ও আন্দোলনকারীদের ‘আরশোলা’ বা ‘ককরোচ’-এর সাথে তুলনা করা হয়। সেই মন্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়েই অর্পিতা এই আন্দোলনে যোগ দেন এবং নিজের মতো করে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ৩৩ বছর বয়সি যোগেশ ইঙ্গালে পুরো কর্মসূচির পেছনের ব্যবস্থাপনা সামলাচ্ছেন। মাইক ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা, প্ল্যাকার্ড তৈরি, অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়—সব কাজ একহাতে সামলাচ্ছেন তিনি।
টানা এক মাস ধরে দিনে মাত্র দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে কিংবা বহুরাত জেগে থেকে তিনি আন্দোলনের রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। মূলত তাদের এই নিরলস ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টাই যন্তর মন্তরের দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনকে প্রাণবন্ত ও গতিশীল রাখছে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।