গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য অংশীদারত্ব চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল যুক্তরাজ্য সরকার। ব্রিটিশ সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সামনে এসেছে এই বিষয়টি।
তবে শেষ পর্যন্ত লন্ডন সেই পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখা হলেও গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে ব্রিটেনের ব্যবসা ও বাণিজ্য দপ্তর যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল ট্রেড পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (টিপিএ) স্থগিত করার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে একটি মূল্যায়ন করেছিল। এই মূল্যায়নে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, মানবিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে লন্ডনে এই আলোচনা শুরু হয়েছিল।
ব্রিটিশ সরকার এর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত করেছিল। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল।
লন্ডনের অবস্থান ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়গুলোতে চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ এবং এসব বসতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে তাঁরা সমর্থন করে না।
যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল ট্রেড পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট মূলত ব্রেক্সিটের পর ২০১৯ সালে করা একটি ধারাবাহিকতা চুক্তি। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি পণ্যের একটি বড় অংশ যুক্তরাজ্যের বাজারে আসে তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে।
সরকারি মূল্যায়নে চুক্তি স্থগিতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনা করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের মতে, এমন সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও ফিলিস্তিনপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশের দাবি, শুধু কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, বরং ইসরায়েলের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োজন।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে গাজা যুদ্ধের পর সেই সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের একাংশ মনে করছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করেও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ব্রিটেনে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু এমপি ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধের দাবি জানিয়েছেন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নতুন সরকারের জন্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে লন্ডনকে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠী ও লেবার পার্টির বামপন্থী অংশ দীর্ঘদিন ধরে গাজা ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের দিকে নজর রাখছে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ঘরোয়া রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত না করলেও, এই মূল্যায়ন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আর আগের মতো নিঃশর্ত অবস্থানে নেই।