Image description

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে সরকার এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ব্রিটেনকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

বার্নহ্যাম সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট অভিযানের জন্য আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তবে এটি নতুন কোনো সামরিক নীতি নয়; বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে।

সরকারের ব্যাখ্যা, এসব ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে "প্রতিরক্ষামূলক" অভিযানের জন্য। লন্ডনের দাবি, ব্রিটেন কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু করছে না; বরং মিত্রদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল রক্ষার অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে দ্রুত।

‘প্রথম বড় ভুল’ বলছেন সমালোচকেরা

ডানপন্থী হেরিটেজ পার্টির নেতা ডেভিড কার্টেন এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, বার্নহ্যাম যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ব্রিটেনকে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছেন। কার্টেনের ভাষায়, ব্রিটেনের উচিত "বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকা"।

অন্যদিকে ব্রিটিশ নাগরিক স্টিফেন প্রিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সঙ্গে ব্রিটেনকে যুক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, এটি নতুন প্রধানমন্ত্রীর "প্রথম বড় ভুল"।

আরেক নাগরিক পল ফিনিও মন্তব্য করেছেন, "প্রথম বড় ভুল, আর ভুলের এটি কেবল শুরু।"

তবে ব্রিটিশ সরকার বলছে, সিদ্ধান্তটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।

ডিয়েগো গার্সিয়া ও আরএএফ ফেয়ারফোর্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থান, যা যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন চাগোস দ্বীপপুঞ্জের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাঁটি ব্যবহার করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

অন্যদিকে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার সামরিক বিমান মোতায়েন করা হয়। ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ঘাঁটির ব্যবহার নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বার্নহ্যামের রাজনৈতিক ঝুঁকি কোথায়?

বার্নহ্যামের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার এই সিদ্ধান্তকে ব্রিটিশ জনগণ কীভাবে গ্রহণ করবে। বিশেষ করে লেবার পার্টির ভেতরে থাকা যুদ্ধবিরোধী ও বামপন্থী অংশের কাছে বিষয়টি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

ইরাক যুদ্ধের পর থেকেই বিদেশি সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে লেবারের ভেতরে সতর্কতা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাজা যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে দলটির একাংশের অসন্তোষ। যুক্তরাজ্যের মুসলিম ভোটারদের একটি অংশও ফিলিস্তিন ইস্যুতে লেবারের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছে।

যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪০ লাখ মুসলিম নাগরিক রয়েছেন। লেবারের বেশ কিছু আসনে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি লেবারের কিছু সমর্থক, বিশেষ করে যুদ্ধবিরোধী কর্মী ও মুসলিম ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে লেবারের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে ইরান সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, ব্রিটেনের সামরিক ভূমিকা কতটা বাড়ে এবং সরকার কীভাবে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয় তার ওপর।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বনাম ঘরের চাপ

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। ন্যাটো জোট, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সামরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

বার্নহ্যামের জন্য তাই এই সিদ্ধান্ত একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখার বিষয়, অন্যদিকে দলের ঐতিহ্যগত সমর্থক গোষ্ঠীর উদ্বেগ সামলানোর চ্যালেঞ্জ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে আসছে। ফলে লন্ডনের এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক ঝুঁকি

সমালোচকদের বড় আশঙ্কা, ব্রিটিশ ঘাঁটি যদি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের অংশ হয়, তাহলে এসব স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

ইরান অতীতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো যদি সামরিক অভিযানে অংশ নেয়, তাহলে তারাও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার অবশ্য বলছে, দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বার্নহ্যামের প্রথম বড় পরীক্ষা

অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুতেই ইরান ইস্যু তাঁর নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সমর্থকদের কাছে এটি হতে পারে একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বশীল মিত্রতার পরিচয়। কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা ব্রিটেনকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এখন নজর থাকবে তিনটি বিষয়ের দিকে: প্রথমত, ইরান সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ ঘাঁটির ব্যবহার কতটা বাড়ে৷ তৃতীয়ত, দেশের ভেতরে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া কোন দিকে যায়।

ক্ষমতার প্রথম সপ্তাহেই বার্নহ্যাম হয়তো বুঝতে পারছেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি আসতে পারে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেই।