ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আইন পাস করেছে ফ্রান্স।
বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে আইনটি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশের জন্য বাধ্যতামূলক বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর পথ তৈরি হয়েছে।
শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় এক দশক পূর্তির আগে এই আইন কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের আশঙ্কা, বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং কিশোরেরা এই বিধিনিষেধ এড়িয়ে যেতে পারবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স সরকার বলছে, বয়স যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনলাইন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে রয়েছে এবং তা নিরাপদ ও কার্যকর।
কিছু বামপন্থি সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও মঙ্গলবার ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ ও নেনেট—পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই বিলটি পাস হয়।
ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স শিশুদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর এই কড়াকড়ি আরোপ করল।
আইনটি কার্যকর করা হবে দুই ধাপে।
প্রথম ধাপে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী কেউ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। নতুন সব অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক হবে।
দ্বিতীয় ধাপে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম বিদ্যমান সব অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, ফ্রান্সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হলে সবাইকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি।
রয়টার্স জানিয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত বয়স যাচাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আগে ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান লে হেনাফ বলেন, বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি আগে থেকেই বিদ্যমান থাকায় দ্রুত আইন কার্যকর করা সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার পর বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এ ধরনের আইন চালু করল ফ্রান্স।
অস্ট্রেলিয়া গত বছরের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে অনেক কিশোর-কিশোরী এখনো বিভিন্নভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
চলতি বছরের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশন জানায়, নিষেধাজ্ঞার আগে যেসব ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ছিল, তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজনেরই এখনো কোনো না কোনোভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট স্টাডিজের অধ্যাপক তামা লিভার বিবিসিকে বলেন, প্রযুক্তিগত দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তবে তার মতে, এই উদ্যোগ অন্তত দেখিয়েছে যে এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি একে ‘একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষায়, অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় তরুণদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেওয়া হয়।
লিভারের মতে, ফ্রান্সের আইন সফল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি, কারণ সেখানে সব ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কিশোররা কম নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে, সংবাদ পড়ার প্রবণতা কমতে পারে এবং রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের অংশগ্রহণও হ্রাস পেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ জোরালো হয়েছে।
জুনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা হবে।
পাশাপাশি ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য মধ্যরাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ‘কারফিউ’ চালুর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
এর আগে মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ইউরোপের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রস্তাব দেন এবং এ বিষয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন নিয়ম চালুর সম্ভাবনার কথা বলেন।