নবম দফায় ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে রাতভর হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার মধ্যরাত থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত এ হামলা চালানো হয়। এরপর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটির ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এই হামলা পাল্টা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে টানা নবম দফায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে জবাবও দিয়েছে ইরান। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে টানা নবম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সামুদ্রিক সম্পদ, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
খবরে বলা হয়, মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলায় ওইসব ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে থাকা মার্কিন সি-১৭ পরিবহন বিমান এবং পি-৮ নজরদারি বিমানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকটি বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, মুওয়াফফাক সালতি (আল-আজরাক) বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ২০টি হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে। এর আগে উত্তর ইরাকে ইরানের একটি ভূপাতিত ড্রোন থেকে পাওয়া অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্ক্রিয় করার সময় একজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হন।
আরেক খবর অনুযায়ী, নতুন করে হামলা পাল্টা হামলার জেরে গতকাল ভোরেও মধ্যপ্রাচ্য কেঁপে উঠেছে। যদিও ‘মার্কিন সেনা হত্যার প্রতিশোধ’ হিসেবে ইরানের ওপর ‘মাত্র এক দফা হামলা’ চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখা শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রাতে আবার তাদের ওপর খুব কঠোর হামলা চালিয়েছি এবং আমরা তা করেছি সম্ভবত তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানে।’
এদিকে ইরানের পাল্টা হামলা সম্পর্কে কুয়েত দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। পাশাপাশি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা সিরিয়ায় ‘শত্রুবাহিনীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে’ অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বিমান হামলার সতর্কতাসূচক সাইরেন ঘন ঘন বেজে উঠছে। নাগরিক ও বাসিন্দাদের কাছাকাছি নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চালানো হামলার পর গতকাল ভোরে পেন্টাগন জানায়, তারা নবম রাতের মতো হামলা শেষ করেছে। জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তেহরান প্রমাণ করছে, ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি তারা সহ্য করতে সক্ষম। তারা এমন প্রাণঘাতী জবাব দিতে পারে, যা যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর পর মার্কিন সামরিক বাহিনী আর দেখেনি। এতে পেন্টাগনও বিস্মিত। যদিও পেন্টাগন তাদের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতির কথা প্রকাশ করছে না। তবে তেহরানের দাবি, তাদের একাধিক দিনের হামলায় প্রচুর সংখ্যায় মার্কিন ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গারের মতো ঘাঁটির মূল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সেতু, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, তখন কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে ইরান, যাতে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরানে হামলায় এসব দেশের ঘাঁটি ব্যবহার করছে বলে ইরান অভিযোগ করে আসছে।
সিএনএনের মতে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রতিদিনের বক্তব্যগুলো আগের দিনের বক্তব্যগুলোর হুবহু কপি পেস্ট বলে মনে হচ্ছে। রবিবার গভীর রাতে তারা জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও সাধারণ নাবিকদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে এ হামলা অব্যাহত থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে ইরানের এই সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনতে পেরেছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুরু হওয়া লড়াই শেষ করতে পারবে, তারও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না; বরং ইরান সমানতালে মার্কিন হামলার জবাব দিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মে মাসে বলেছিলেন, ভূগর্ভস্থ গুদামগুলোতে ইরানের কাছে এখনো অন্তত ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন মজুত রয়েছে। এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা’ কেবল মার্কিন বিমান হামলার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’ পডকাস্টের এক পর্বে জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘আপনি তাদের ওপর বোমা ফেলতে পারেন, তাদের রাডার ধ্বংস করতে পারেন, তাদের কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু প্রণালিতে যাতায়াতকারী জাহাজে আঘাত করা তাদের জন্য অত্যন্ত সহজ। আর এখন ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সেনাদেরও একই ধরনের প্রাণঘাতী বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।’
হরমুজ পার হতে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস : মেহের নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। রবিবার দিনগত গভীর রাতে চালানো হামলায় ট্যাংকার দুটিতে বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় জাহাজ দুটি একটি অনিরাপদ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ নৌপথ দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার চেষ্টা করছিল।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শিশুহত্যাকারী মার্কিন সেনাবাহিনী ওই দুটি ট্যাংকারকে এমন একটি নৌপথ ব্যবহার করতে বাধ্য করেছিল, যেটিকে তারা আগে থেকেই অনিরাপদ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে ঘোষণা করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এটি আমাদের ভূখণ্ড। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’ আইআরজিসি সতর্ক করে জানায়, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে এই জলপথ রাসায়নিক সার পরিবহন কিংবা এক ফোঁটা তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্যও নিরাপদ থাকবে না। এ ছাড়া আইআরজিসি আগ্রাসি মার্কিন বাহিনীকে এ ঘটনার জন্য শাস্তিমূলক অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, চলতি মাসের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালি সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য বন্ধ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না থামানো পর্যন্ত এটি বন্ধই থাকবে।