ভারতের রাজধানীর বুকে যখন প্রতিবাদের ঢেউ, তখনই বন্ধ হয়ে গেল ইন্টারনেটের দরজা। সংসদ অভিযানের ডাককে ঘিরে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। সরকারের এই পদক্ষেপ ঘিরে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন- আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের নামে কি এবার প্রতিবাদের আওয়াজও ডিজিটালভাবে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে?
ককরোচ জনতা পার্টির ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করে বাধা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। যার ফলে বহু পড়ুয়া আহত হন। এমনকি ব্যারিকেডে ইলেক্ট্রিসিটি লাগিয়ে রাখার অভিযোগও ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। অনেকেই ইলেক্ট্রিক শকড খান বলেও আন্দোলনকারীরা জানান।
এর মধ্যেই মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। জানা গিয়েছে, এয়ারটেল, জিও ও ভোডাফোন-আইডিয়ার মতো টেলিকম সংস্থাগুলিকে পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। বহু ব্যবহারকারীর ফোনে বার্তাও আসে- সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী তাদের এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠছে, গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদের সময় কেন বারবার ইন্টারনেট বন্ধের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে? ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (IFF) অভিযোগ করেছে, পরিষেবা বন্ধের সরকারি নির্দেশ প্রকাশ করা হয়নি। তাদের দাবি, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে কারণ, সময়সীমা ও আইনি ভিত্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
IFF-এর বক্তব্য, সাধারণ মানুষ যদি জানতে না পারেন কে নির্দেশ দিল, কেন দিল এবং কতক্ষণ পরিষেবা বন্ধ থাকবে, তাহলে স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।
সমালোচকদের মতে, আজকের দিনে ইন্টারনেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়- এটি সংবাদ জানার, মত প্রকাশের এবং প্রশাসনের জবাবদিহি চাওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই আন্দোলনের সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা মানে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা নয়, মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারেও প্রভাব ফেলা।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়, বড় জমায়েত ও সম্ভাব্য অশান্তির পরিস্থিতিতে গুজব ছড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ইন্টারনেট শাটডাউন ট্র্যাকার অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে ভারত বিশ্বের অন্যতম বেশি ইন্টারনেট বন্ধ করা দেশের তালিকায় রয়েছে। IFF আরও জানিয়েছে, দিল্লিতে এর আগেও আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২১ সালে কৃষক আন্দোলনের সময়ও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবাদ দমন করতে প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার, তার সঙ্গে যোগাযোগের পথও বন্ধ - এই দুইয়ের সমন্বয় নিয়েই এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার বদলে প্রতিবাদের রাস্তা সংকুচিত করছে। IFF বলেছে, নেট বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী এবং যাদের প্রতিদিনের আয় ডিজিটাল পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত।