রাশিয়ার সারাতোভ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এংগেলস বিমান ঘাঁটিতে এক বিধ্বংসী দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এই সফল অভিযানে ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণকারী রাশিয়ার একটি শক্তিশালী টিইউ-৯৫ বোমারু বিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা বাহিনী (এসবিইউ) এই সফল হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে কিয়েভ পোস্ট।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ অভিযানকে মস্কোর বিরুদ্ধে আরও একটি সফল অভিযান হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
শুক্রবার এসবিইউ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের দূরপাল্লার ড্রোন প্রায় ৮০০ কিলোমিটার (প্রায় ৫০০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে এই বিমানে আঘাত হানে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থাটি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানায়, ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ওই যুদ্ধবিমানটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর লেজের অংশটি মূল বডি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিমানটি দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের বেসামরিক এলাকা ও শহরগুলোতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কাজে ব্যবহার করে আসছিল রুশ বাহিনী।
জেলেনস্কির নির্দেশিত লক্ষ্য অনুযায়ী রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়। এসবিইউ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা পদ্ধতিগতভাবে রুশ যুদ্ধযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ধ্বংস করে চলেছে।
এ হামলার পর রাশিয়ার বিমান বাহিনী তাদের সবচেয়ে প্রত্যন্ত সামরিক বিমানঘাঁটিতেও আর নিরাপদ নয় বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইউক্রেন।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি টেলিগ্রামে ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই বীরত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি এই আক্রমণকে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে একটি ‘ন্যায্য ও সক্রিয় প্রতিরক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। জেলেনস্কি আরও বলেন, একই সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী সাময়িকভাবে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত রুশ তেল শিল্পের বিভিন্ন স্থাপনা এবং সুনির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও সফল আঘাত হেনেছে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনের ওপর আগ্রাসন চালানোর জন্য রাশিয়াকে প্রতিনিয়ত আরও বড় মূল্য দিতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে ইউক্রেনের দাবির বিষয়ে ক্রেমলিন বা রাশিয়ার সরকারি মহলের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
টিইউ-৯৫ রাশিয়ার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ
সামরিক ইতিহাসে টিইউ-৯৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান। ১৯৫২ সালে প্রথম আকাশে ওড়া এই যুদ্ধবিমানটি আজও রাশিয়ার বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহক। সামরিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল নাগাদ রাশিয়ার বিমান বহরে ৪৫টি টিইউ-৯৫এমএস এবং ১৮টি আধুনিক প্রযুক্তির টিইউ-৯৫এমএসএম বোমারু বিমান ছিল। আধুনিক সংস্করণের এই বিমানগুলো রাশিয়ার অতি আধুনিক কেএইচ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
অন্যদিকে পুরানো বিমানগুলো সোভিয়েত আমলের কেএইচ-৫৫ এবং কেএইচ-৫৫৫ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়া বা রাতেও নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম এই বিমানটি একসঙ্গে ছয়টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। বিমানটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এনকে-১২ টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন দ্বারা চালিত, যা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একে কার্যকর রাখলেও এটি বিশ্বের অন্যতম উচ্চ শব্দকারী সামরিক বিমান।
এই বিমানের ক্রু সংখ্যা ৭ জন, বোঝাই ওজন ১৯০ মেট্রিক টন এবং এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮৩০ কিলোমিটার। ২ কোটি ৬০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের এই বিমানের যুদ্ধ ব্যাসার্ধ ৬ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ রেঞ্জ ১৩ হাজার কিলোমিটার।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, টিইউ-৯৫এমএস বিমানটি ইউক্রেনে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য রাশিয়ার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কারণ এটি রাশিয়ার অপর আধুনিক বোমারু বিমান টিইউ-১৬০-এর চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ।
ডিফেন্স এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী টিইউ-১৬০ বিমানটি খুব কম ব্যবহার করে এবং ইউক্রেনে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সিংহভাগই টিইউ-৯৫এমএস বিমান দিয়ে পরিচালনা করা হয়। এই বিমান থেকে নিক্ষেপ করা প্রতিটি কেএইচ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক রেঞ্জ ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং এর ওজন প্রায় ২ হাজার ৪০০ কেজি।
উৎক্ষেপণের পর এটি আকাশে নিজের গতিপথ ও দিক পরিবর্তন করতে পারে বলে একে মাঝআকাশে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। প্রায় ৩০ লাখ ডলার মূল্যের এই ক্ষেপণাস্ত্রটি রাশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রচলিত অস্ত্রের একটি, যা তাদের অপর বিখ্যাত কালিব্র ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামি।