Image description

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুশ্চিন্তায় দেশটি। কারণ সংকীর্ণ করিডরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও ত্রিপুরা রাজ্যের সংযোগ করেছে। এখান দিয়েই রাজ্যগুলোতে সব ধরনের রসদ, পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম যায়। ফলে এটি বন্ধ হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তৈরি হবে আঞ্চলিক অখণ্ডতায় হুমকি।

 

নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চীন সীমান্তের মিলনস্থল এই করিডরটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। এ জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গে সফরে যাচ্ছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার (১৮ জুলাই) শিলিগুড়ির ‘উত্তরকন্যা’ সচিবালয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন ও অনুপ্রবেশ রোধের মতো বিষয়গুলো এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা হতে চলেছে। সীমান্ত সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টিও বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে।

 

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের মুখ্য সচিব, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক (ডিএম) এবং পুলিশ সুপারদের (এসপি) উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কয়েক দফায় শিলিগুড়ি করিডর পরিদর্শন করেছেন।

 

নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও নিশ্ছিদ্র করতে শহরটিকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ (এনএসআর) বা জাতীয় কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে নয়াদিল্লি। এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈরী সম্পর্কের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই জট কেটেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরে গড়িমসি করার অভিযোগ ছিল তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির। তবে নতুন রাজ্য সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত গতি পেয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজও দ্রুত গতিতে শুরু হয়েছে।

 

সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বিএসএফের হাতে ১ হাজার ২৫ দশমিক ৭৫ একর জমি হস্তান্তর করেছে। এই জমির মোট দৈর্ঘ্য ১৭২ দশমিক ৬০৯২২ কিলোমিটার। এই উদ্যোগের ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি জমি দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায় ও সবচেয়ে কম দেওয়া হয়েছে জলপাইগুড়িতে। জেলাভিত্তিক জমি হস্তান্তরের খতিয়ানে দেখা যায়, মালদহ জেলায় ১৭৬ দশমিক ৭৮ একর, কোচবিহারে ১৩৫ দশমিক ৩৩ একর, দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৬ দশমিক ৪১ একর, উত্তর দিনাজপুরে ৬ দশমিক ৬১ একর, দার্জিলিংয়ে ৪ দশমিক ৩১ একর এবং জলপাইগুড়ি জেলায় ২ দশমিক ১৭ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

উত্তরকন্যার বৈঠকে এই জমি হস্তান্তর ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

 

ভারতের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ জেলা মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে নদী ও জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই।

 

তবে অরক্ষিত এই নদী সীমান্তগুলোতে বিএসএফের টহল অনেক বাড়ানো হয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে কোচবিহারে সবচেয়ে দীর্ঘ অর্থাৎ ৫৫০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এরপর দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৫০ কিলোমিটার এবং উত্তর দিনাজপুরে ২২৭ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি নেপাল ও ভারতের মধ্যকার ১ হাজার ৭৫১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

 

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন, এই সময়