‘এটাই শেষ। আমি আর বাঁচব বলে মনে হয় না। আমাকে এখানে হত্যা করার জন্যই আনা হয়েছে।’ এ কথাগুলো চলতি মাসের শুরুতে নিজের আইনজীবীকে বলেছিলেন ডা. হুসাম আবু সাফিয়া। তিনি উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন। আঠারো মাস আগে ইসরায়েলি বাহিনী তাকে আটক করে। এরপর থেকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ডা. আবু সাফিয়া জানিয়েছেন, তাকে হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। প্রতিদিন মারধর করা হয়। অনেক সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সম্প্রতি প্রকাশিত তার ছবিতে দেখা যায়, অবরুদ্ধ গাজার স্বাস্থ্যকর্মীদের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত সেই মানুষটি এখন অনেক বেশি শীর্ণ ও দুর্বল। অথচ একসময় অসম্ভব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার কথা বিশ্বকে জানিয়ে আসছিলেন।
জুন মাসে আবু সাফিয়াকে রাকেফেত কারাগারে নেওয়া হয়। এটি একটি ভূগর্ভস্থ কারাগার। প্রথমে এটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের শীর্ষ নেতাদের রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে অমানবিক পরিবেশের কারণে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এটি আবার চালু করেন। আবু সাফিয়া এবং সেখানে আটক অন্য ফিলিস্তিনি বন্দিরা কখনো দিনের আলো দেখতে পান না। এটি জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েলে তার মতো প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে ‘প্রশাসনিক আটক আইনের’ আওতায় বন্দি রাখা হয়েছে। প্রতি ছয় মাস পরপর এ আটকাদেশ নবায়ন করা যায়। এভাবে অনির্দিষ্টকাল তাদের বন্দি রাখা সম্ভব। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন শিশু। এ আইনে কোনো ফিলিস্তিনিকে আটক করা হলে বাস্তবে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপহরণ করা হয়।
আটকের পর শুরু হয় নরকযন্ত্রণা। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলি আল সামুদি এ বছর মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু তাকে দেখে চেনাই কঠিন ছিল। বন্দিদশায় তিনি প্রায় ৬০ কেজি ওজন হারিয়েছেন। অর্থাৎ তার শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজন কমে গেছে। সিএনএনকে তিনি বলেছেন, ‘কারাগার শব্দের প্রকৃত অর্থেই নরক। আমাদের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার সবই ছিল শাস্তি আর প্রতিশোধ।’
ইসরায়েলি কারাগারে নির্যাতন, নিপীড়ন ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বহু নথিপত্র ও প্রতিবেদন রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে এমন কিছু ছবি প্রকাশ পায়, যা ইরাকের আবু গারিব কারাগারের নির্যাতনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। চলতি মাসের শুরুতে একজন ইসরায়েলি সেনার তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, গাজার এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তিকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে একটি তক্তা ও লোহার রডের সঙ্গে। ছবিটির ক্যাপশনে হিব্রু ভাষায় লেখা ছিল, ‘সুপ্রভাত’। ছবিটি আবু গারিবের স্মৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। সেখানে ছিল বন্দিকে অপমান করার প্রকাশ্য উল্লাস, পোশাক খুলে যৌন অপমানের পরিবেশ তৈরি করা এবং সেই দৃশ্যকে ট্রফির মতো ছবি তুলে প্রদর্শনের মানসিকতা। এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমান যুদ্ধের সময়ও এগুলোর সৃষ্টি হয়নি, যদিও এ সময়ে এর মাত্রা বেড়েছে। ‘প্রশাসনিক আটক’ এবং বন্দিদের ওপর নির্যাতন দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থার অংশ। এ ব্যবস্থা ফিলিস্তিনিদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং সামষ্টিক শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যও এতে স্পষ্ট।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল নিহত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে আসছে। কিছু মরদেহ সামরিক নিয়ন্ত্রিত সিল করা এলাকায় নম্বরযুক্ত কবরস্থানে দাফন করা হয়। অন্যগুলো হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এসব মরদেহের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলি হেফাজতে মারা যাওয়া অন্তত ১০০ জন ফিলিস্তিনি। তারা কীভাবে মারা গেছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এরপর আসে নিখোঁজ মানুষের কথা। গাজায় এমন অনেক মানুষ আছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করেছিল। কিন্তু পরে তাদের আটকের কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হামোকেদ এই ঘটনাগুলোকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচনা করে। সংস্থাটি প্রায় দুই হাজার মানুষের খোঁজ বের করার চেষ্টা করছে। এসব ঘটনা কেবল কয়েকটি উদাহরণ। এগুলো এমন এক বাস্তবতার ঝলক, যেখানে ফিলিস্তিনিরা নির্যাতনের এক স্থায়ী ব্যবস্থার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। এর ফলে তাদের জীবনে বহুস্তরীয়, বহুমাত্রিক এবং গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা যেন বারবার তাদের জানিয়ে দেয়, তাদের জীবন এমনকি মৃত্যুর পর তাদের মরদেহও ইসরায়েলি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
নির্যাতনের এ বাস্তব অবকাঠামো যথেষ্ট ভয়াবহ। এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক। সেটি হলো মানুষের স্বাধীন সত্তাকে ধীরে ধীরে চেপে ধরা এবং নিঃশেষ করে দেওয়ার এক অবিরাম প্রক্রিয়া। যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অনেকেই সমাজে নেতার ভূমিকা পালন করতেন অথবা সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং নাগরিক সমাজের সদস্য। এরা একটি রাষ্ট্র বা সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলেন। তাদের ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে যেন এ বার্তাই দেওয়া হচ্ছে, ফিলিস্তিন নামে কোনো রাষ্ট্র নেই এবং ফিলিস্তিনি নামে কোনো জনগোষ্ঠীরও অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব ঘটনার বড় অংশই সবার চোখের সামনেই ঘটছে। অনেক সময় একটি ছবিই পুরো ঘটনার প্রমাণ হয়ে উঠছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে, একজন ফিলিস্তিনি বন্দি যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কোথাও দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বাস পরা একজন মানুষকে লোহার দণ্ডের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার নথি তৈরি করছে। ইসরায়েলি সেনারাই অনেক ছবি প্রকাশ করছে। ইসরায়েলি রাজনীতিকরা অনেক সময় এসব নিয়ে গর্বও করছেন। তবু ইসরায়েলের ভেতরে এর বিরুদ্ধে খুব কম প্রতিবাদ দেখা যায়। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক মিত্র রাষ্ট্রও প্রকৃত ক্ষোভ প্রকাশ বা কার্যকর পদক্ষেপের দাবি খুব কমই তোলে।
যুক্তরাজ্যে এখন বেশি আলোচনা হয় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে। তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও এসেছে। সম্প্রতি অ্যান্ডি বার্নহ্যামও এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এতে মনে হয়, সমস্যার মূল উৎসকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যখন অন্ধকার কারাগার থেকে দুর্বল হয়ে পড়া ফিলিস্তিনি বন্দিদের সামনে আনা হয়, তখন মনে হয় তাদের মৃত্যুর খবর যেন আগেই লেখা হয়ে গেছে। সেই দৃশ্য আমাকে আবু গারিব কারাগারের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানকার ছবিগুলো একসময় বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেগুলো এক যুগের লাগামহীন ক্ষমতা, বর্ণবাদ এবং নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তা সম্ভব হয়েছিল, কারণ তখন এমন গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল, যারা তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি তুলেছিল। আজ সেই কণ্ঠ কোথায়? ইসরায়েলের ভেতরে অথবা বাইরের যেসব দেশ ইসরায়েলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাদের মধ্যেও কি সেই কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে?
সম্প্রতি জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের উপস্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘটিত নথিভুক্ত যৌন সহিংসতার ঘটনায় যুক্তরাজ্য উদ্বিগ্ন। তিনি ইসরায়েলকে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি কিছুটা আশার কথা। কিন্তু আমার ধারণা, সবাই জানেন, সে তদন্ত কখনোই হবে না। কারণ যা ঘটছে, তা কোনো বিচ্যুতি নয়। এটি কোনো ব্যতিক্রমও নয়। এটি এমন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদন পেয়েছে। মনে হয়, ইসরায়েলি সমাজেরও একটি অংশ সেটিকে মেনে নিয়েছে। এ বাস্তবতার মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা আটক হবেন, নিখোঁজ হবেন, নির্যাতনের শিকার হবেন এবং যৌন সহিংসতার শিকার হবেন। আর যারা এসব করবে, তাদের কাছেই মাঝেমধ্যে ভদ্রভাবে, উদ্বেগ প্রকাশ করে, নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরাই তদন্ত করার অনুরোধ জানানো হবে।
লেখক: গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি
কালবেলা