Image description

তায়েব শাদি

ফ্রান্সের কাছে হারের পরও মরক্কোর মূল গল্পটা একদমই বদলায়নি। ‘অ্যাটলাস লায়ন’ খ্যাত মরক্কোর জাতীয় ফুটবল দল প্রমাণ করেছে, বিশ্ব ফুটবলে তাদের উত্থান কোনো আকস্মিক চমক বা রূপকথা নয়; বরং তারা এখন সাফল্যের এক পরিণত মডেলে পরিণত হয়েছে। আর ঠিক এখানেই বদলে গেছে সব হিসাব-নিকাশ।

একটি সঠিক কাঠামো যখন নিয়মিত সাফল্য এনে দেয়, তখন শুধু অন্যদের দেখার চোখই বদলায় না। এর ফলে একটি জাতি নিজেদের নতুনভাবে চিনতে শেখে। তাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গাতেও আসে এক বিশাল পরিবর্তন।

কয়েক দশক ধরে মরক্কোর ফুটবলের বড় সাফল্যগুলোকে অনেকটা জাদুর মতো মনে করা হতো। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ কিংবা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের শুরুর দিকের চমক—এগুলো ছিল অবিস্মরণীয় স্মৃতি। কিন্তু এরপরই নেমে আসতো এক দীর্ঘ নীরবতা, যেখানে মানুষ কেবল ভাগ্যের দিকে চেয়ে থাকতো। কিন্তু সেই যুগ এখন অতীত। ভালো পারফরম্যান্স করাটা এখন মরক্কোর কাছে ব্যতিক্রম কিছু নয়, বরং এটাই তাদের স্বাভাবিক রুটিন। বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিরা এখন আর মরক্কোকে কেবল কৌতূহলের দৃষ্টিতে দেখে না; তারা মরক্কোকে নিয়ে পড়াশোনা করে, তাদের বিপক্ষে আলাদা প্রস্তুতি নেয়। বিশ্বমঞ্চে মরক্কো এখন একটি সমীহ জাগানিয়া নাম। এটাই হলো সত্যিকারের রূপান্তর।

এই সাফল্যের রহস্য কোনো ড্রেসিংরুমের ম্যাজিক বা একটিমাত্র ম্যাচের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর শেকড় লুকিয়ে আছে সঠিক কাঠামো, দূরদর্শিতা এবং ধৈর্যের মধ্যে। সহজ কথায়, এটি এমন এক রাষ্ট্রীয় নীতি—যা সময়ের পরিক্রমায় একটি সফল জাতীয় প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

ফুটবল এখন আর মরক্কোর কাছে শুধুই আবেগের গল্প নয়, এটি তাদের ‘সফট পাওয়ার’ বা নীরব কূটনীতির অন্যতম হাতিয়ার। প্রতিটি জয় বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে—মরক্কো এখন একটি সুসংগঠিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জাতি, যারা প্রতিভাকে টেকসই সাফল্যে রূপান্তর করতে জানে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে পাঁচটি সুদৃঢ় ভিত্তি:

কৌশলগত দূরদর্শিতা ও অবকাঠামো

কোনো দেশ দুর্ঘটনাক্রমে ফুটবলের পরাশক্তি হতে পারে না। খেলাধুলাকে যখন কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, কেবল তখনই এমনটা সম্ভব। ‘ষষ্ঠ মোহাম্মদ ফুটবল কমপ্লেক্স’ শুধুই একটি ট্রেনিং সেন্টার নয়, এটি মরক্কোর জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তারা বুঝতে পেরেছে, আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভা থাকলেই চলে না। আধুনিক মাঠ, স্পোর্টস মেডিসিন, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ফিটনেস, পুষ্টি এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার সমন্বয়ে খেলোয়াড়দের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে তারা।

প্রবাসী প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার

মাদ্রিদ, আমস্টারডাম, ব্রাসেলস, প্যারিস বা লন্ডনে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়রা ইউরোপের সেরা একাডেমিগুলো থেকে তৈরি হয়ে আসছেন। মরক্কো এই মেধা পাচারকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় পরিণত করেছে। এই প্রবাসী খেলোয়াড়রা যখন স্বদেশের জার্সি গায়ে জড়ানোকেই বেছে নেন, তখন মরক্কো শুধু প্রতিভাকেই কাজে লাগায় না; বরং বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলীয় সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতাকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।

সুশাসন ও শৃঙ্খলা

আধুনিক ফুটবলে প্রতিভাকে বিকশিত করতে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর প্রয়োজন। মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।

জাতীয় আত্মপরিচয়

অ্যাটলাস লায়নরা শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্য মাঠে নামে না। তারা খেলে তাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য। নব্বই মিনিটের জন্য তারা কোটি কোটি মরক্কানকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে, ভুলিয়ে দেয় সব ধরনের সামাজিক ও ভৌগোলিক ব্যবধান। ভালো দলের হয়তো কৌশল থাকে, কিন্তু সেরা দলগুলোর থাকে একটি ‘আত্মা’।

২০৩০ বিশ্বকাপের অনুঘটক

মরক্কো ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক। এটি তাদের জন্য চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং উন্নয়নের একটি মাধ্যম। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দেশে অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধায় ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে। এটি মরক্কোকে কেবল স্বপ্ন দেখা নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে দায়িত্ব নিতে সক্ষম একটি দেশ হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে শেখাচ্ছে।

মরক্কোর আসল চ্যালেঞ্জ এখন পরবর্তী প্রতিপক্ষ নয়, বরং এই শ্রেষ্ঠত্বকে স্থায়ী করা। কারণ খেলাধুলা কিংবা ইতিহাস—সব জায়গাতেই টিকে থাকার ক্ষমতাই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মরক্কোর এই অর্জন শুধু ফুটবলের সবুজ গালিচাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি প্রমাণ করে যে—সঠিক দূরদর্শিতা, অবকাঠামো, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থাকলে যেকোনো পরাশক্তির সঙ্গেই পাল্লা দেওয়া সম্ভব। ফুটবলের এই সফল মডেল কেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ব্যবহার করা যাবে না?

অলৌকিক কোনো ঘটনা দিয়ে কোনো জাতি সামনের সারিতে পৌঁছাতে পারে না। এর জন্য আবেগের বদলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আর সাময়িক চমকের বদলে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। অ্যাটলাস লায়নরা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি ফুটবল দল চাইলে গোটা জাতিকে দেখাতে পারে—তারা সম্মিলিতভাবে ঠিক কতটা অর্জন করতে সক্ষম।

ফুটবলে জাদুর দিন শেষ। এখন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আর কাঠামোগত পরিকল্পনাই বিশ্বমঞ্চে রোল মডেল হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।

  • লেখক: মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা-ভিত্তিক একজন পরামর্শক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক