Image description

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার উত্তর-পশ্চিমে দেইর আম্মার শরণার্থী শিবির। সেখানে রোববারের সকাল শুরু হয়েছিল এক ছোট্ট পরিবারের আনন্দকে ঘিরে। তিন মাসের ছেলে আহমাদ জায়েদের জন্মসনদ সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছিলেন বাবা মারুফ জায়েদ। পরদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে জেরিকো বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আনন্দ পরিণত হয় গভীর শোকে।

সেদিন দুপুরে আহমাদের মা ইয়াসমিন জায়েদ হঠাৎ দেখেন, তাঁর ছেলে আর সাড়া দিচ্ছে না। দ্রুত তাঁকে কাছের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেন। রামাল্লার একটি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ডাকা হয় অ্যাম্বুলেন্স।

কিন্তু দেইর আম্মার থেকে রামাল্লার পথে ইসরায়েলি সেনারা একটি বন্ধ গেট হয়ে দাঁড়ায় জীবন-মৃত্যুর বাধা। পরিকল্পনা ছিল, গেট পর্যন্ত গাড়িতে এনে আহমাদকে অক্সিজেন মাস্কসহ চিকিৎসাকর্মীরা হেঁটে গেট পার করে অপর পাশে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেবেন। কিন্তু সেখানে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনারা গেট খুলতে রাজি হননি। এমনকি পরিবারের সদস্যদের হেঁটে পার হতেও বাধা দেয়।

আহমাদের ফুফু ফাতিমা আল-আব্দ খলিল বলেন, সেনারা তাদের ফিরে যেতে চিৎকার করে বলেন এবং গুলি করার হুমকি দেন। তিনি বলেন, শিশুটিকে দেখার পর সেনারা কিছুক্ষণ থমকে গেলেও, পরে আরও কঠোর আচরণ করেন।

ছেলেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে মারুফ আহমাদকে কোলে নিয়ে সেনাদের দিকে এগিয়ে যান। তখন শিশুটির মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্কও খুলে যাচ্ছিল। তিনি সেনাদের কাছে আকুতি করেন, ‘আমার ছেলে মারা যাচ্ছে। আমাকে গুলি কর, তবুও ওকে যেতে দাও।’

দেইর আম্মার এবং রামাল্লায় প্রবেশের প্রধান সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ইসরায়েলি সামরিক গেট। ছবি: সংগৃহীতদেইর আম্মার এবং রামাল্লায় প্রবেশের প্রধান সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ইসরায়েলি সামরিক গেট। ছবি: সংগৃহীত

পরিবারের দাবি, এর জবাবে সেনারা কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে। বাধ্য হয়ে তারা ফিরে এসে দীর্ঘ ঘোরা পথে কাঁচা রাস্তা ধরে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে আহমাদকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা সম্ভব হলেও, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। যেদিন মারুফ তাঁর ছেলের জন্মসনদ সংগ্রহ করেছিলেন, সেদিনই তাঁকে রামাল্লায় মৃত্যুসনদও সংগ্রহ করতে হয়।

এটাই আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেইর আম্মারের সামরিক গেটটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে তিনটি গ্রামের প্রায় ১৮ হাজার মানুষ রামাল্লার বিভিন্ন সেবা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

ইয়াসমিন বলেন, ‘অন্তত কেউ অসুস্থ হলে বা মৃত্যুর মুখে থাকলে গেটটা খুলে দেওয়া উচিত।’

ফাতিমা আল-আব্দ খলিলের মতে, আহমাদের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের বাস্তবতারই অংশ এটি। তিনি বলেন, ‘এটি প্রথম নয়, শেষও নয়। প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে হাসপাতালে যেতে হয়। এটাই আমাদের জীবন।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই অধিকৃত পশ্চিম তীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে ২৩৩টি ঘটনার নথিভুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসাসেবায় বাধা দেওয়া বা চলাচল সীমিত করার অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বর্তমানে অন্তত ৯২৫টি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। স্থায়ী ও অস্থায়ী চেকপয়েন্ট, সামরিক গেট, রাস্তা অবরোধ এবং মাটির বাঁধের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থার কারণে প্রায় ৩৪ লাখ ফিলিস্তিনির চলাচল করতে কষ্ট হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের সেন্ট্রাল ওয়েস্ট ব্যাংক বিভাগের পরিচালক সালাহ আল-খাওয়াজা বলেন, এই গেট ও সড়কব্যবস্থা শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়; বরং ফিলিস্তিনি জনপদগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ। তাঁর ভাষ্য, চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতিতে এসব বাধার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব দেখা যায়।

মৃত্যুর পরও ছিল বিধিনিষেধ

পরিবারের দাবি, আহমাদের মৃত্যুর পরও বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের। তাঁদের ভাষ্য, ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ ফোন করে জানিয়ে দেয়, জানাজা ও দাফনে রাজনৈতিক স্লোগান, শহীদের পোস্টার বা জনসমক্ষে রাজনৈতিক প্রদর্শন করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়।

শেষ পর্যন্ত আহমাদের জানাজায় ছিল শুধু তাঁর কফিনে মোড়ানো একটি পতাকা।

তিন কন্যাসন্তানের পর বহু প্রতীক্ষায় জন্ম নিয়েছিল আহমাদ। ছেলে সন্তানের আশায় ইয়াসমিন তিন দফা বন্ধ্যত্বের চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের জন্মের নয় বছর পর আমার ছেলেটা এসেছিল।’

ছেলের মৃত্যুর পর থেকে মারুফ কিছুই খেতে বা পান করতে পারছেন না বলে জানিয়েছে পরিবার। তিনি এখনও সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।

আহমাদের ফুফু সেনিওরা জায়েদ বলেন, ‘আমরা সবাই যেন পাগল হয়ে যাচ্ছি। সে আমাকে বারবার বলে, আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আসতে চাই। আমি তাকে কবর থেকে ফিরিয়ে আনতে চাই।’