Image description

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় (১৩১ দিন) পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার নিজস্ব কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর থেকে জুলাইয়ের শেষকৃত্যের আগপর্যন্ত আইনি ও ধর্মীয় নির্দেশনাবলী মেনে মরদেহটি হিমাগারে ফরেনসিক মর্গে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

 

ইসলামী রীতি অনুযায়ী মরদেহ দ্রুত, আদর্শগতভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বেশ কিছু মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই আনুষ্ঠানিকতা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রথমত, খামেনির মৃত্যুর পরপরই তেহরানসহ ইরানের অন্যান্য শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। সক্রিয় বিমান হামলার এই হুমকির মুখে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটানো এবং বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানানো অসম্ভব ও অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। গত জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পালন এবং সংঘাত থামানোর প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরই কেবল বিশাল জনসমাগমের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় কর্তৃপক্ষ।

 

তাছাড়া চলমান নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আশঙ্কার কারণে শীর্ষ নেতাদের জনসমক্ষে আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলের সক্রিয় নজরদারি এবং হত্যার হুমকির কারণে খামেনির ছেলে তথা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান পুরোপুরি এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত একটি পরিবেশ তৈরি করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা যেকোনো মূল্যে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির শেষকৃত্যের মতো ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হুড়োহুড়ির পুনরাবৃত্তি এড়াতে চেয়েছিল।

ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক রাসায়নিক দিয়ে মরদেহ সংরক্ষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায়, সাবেক এই নেতার মরদেহ সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করেছে। বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, ফরেনসিক মর্গগুলোর ভেতরে হিমাগারে মরদেহটি হিমায়িত করে রাখা হয়েছিল। যদিও এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, তবে শিয়া ফিকহ বা আইনশাস্ত্রে যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতিতে দাফন বিলম্বিত করা এবং হিমায়িত সংরক্ষণাগারে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। ফলে সরকারের জন্য এই ধর্মীয় ছাড় বা ফতোয়া পাওয়া সহজ হয়েছিল।

 

উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির সেই বিমান হামলায় খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হন এবং তাদের মরদেহও খামেনির সঙ্গেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

 

অবশেষে শুক্রবার (৩ জুলাই) আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তার আত্মীয়দের কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য মরদেহটি সেখানে রাখা হয়েছে। এরপর ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরজুড়ে এক সপ্তাহব্যাপী বিশাল গণ-শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী শুক্রবার (৯ জুলাই) খামেনির নিজ শহর মাশহাদের অত্যন্ত সম্মানিত ও পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে দাফনের মাধ্যমে এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে।