প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য আবারও টুরিস্ট ভিসা চালু করেছে ভারত। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দুই বছরে বাংলাদেশিদের ভ্রমণের মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।
ভারতের বিকল্প হিসেবে একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেড়েছে, অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ নতুন গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ভারতীয় ভিসা চালু হলেও খুব তাড়াতাড়ি এই ভ্রমণ প্রবণতা বদলাবে না বলেই মনে করেন তাঁরা।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ পর্যটন, কেনাকাটা, ধর্মীয় ভ্রমণ ও পারিবারিক সফরের জন্য ভারতে যেতেন। সহজ যোগাযোগ, তুলনামূলক কম খরচ এবং সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দার্জিলিং, সিকিম, কাশ্মীর, দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর ও গোয়া ছিল বাংলাদেশিদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত সরকার। এরপর থেকে ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের পর মেডিকেলসহ কিছু জরুরি ভিসা দেওয়া হতো। বন্ধ ছিল পর্যটন ভিসা। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী চলতি বছরের ২৫ জুন ভিসা আবেদন গ্রহণ কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন। ২৮ জুন থেকে এই ভিসা আবেদন নেওয়া হচ্ছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতগামী পর্যটকদের বড় অংশ সংগঠিত হয়ে ভ্রমণ করেন। এতে ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন, হোটেল বুকিং এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাত নতুন করে সচল হতে শুরু করবে। তাঁরা এ-ও বলছেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশিদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের বৈচিত্র্য বেড়েছে। আগে যেখানে অনেকের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত, এখন একই পর্যটক মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা নেপালকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে ভারত আবারও জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠলেও আগের মতো আর একচ্ছত্র থাকবে না।
পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, ভারতের পরিবর্তে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায়। সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং সহজ ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে এসব গন্তব্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়েছে। নেপাল প্রকৃতিপ্রেমী ও পাহাড় ভ্রমণভিত্তিক (ট্রেকিং) পর্যটনের জন্য নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে সমুদ্রসৈকত, অবকাশযাপন ও পারিবারিক ভ্রমণের চাহিদা বেড়েছে। শ্রীলঙ্কাও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশটিতে ৩ হাজার ৬২৯ জন বাংলাদেশি পর্যটক গিয়েছিলেন। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গেছেন যথাক্রমে ৫ হাজার ৪০৬ ও ৫ হাজার ৮১৪ জন। শ্রীলঙ্কা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট অথরিটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ৫৯ হাজার ৫৬৩ জন বাংলাদেশি পর্যটক গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে গিয়েছিলেন ৩৯ হাজার ৫৫৫ জন। মালদ্বীপের পর্যটন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৩ হাজার ২৯৫ জন বাংলাদেশি পর্যটক গিয়েছিলেন। তার আগের বছর গিয়েছিলেন ২৮ হাজার ৩৩৬ জন।
বাংলাদেশ আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস ফোরামের (বিওটিওএফ) সভাপতি চৌধুরী হাসানুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘দুই বছরে তৈরি হওয়া নতুন ভ্রমণ-অভ্যাস আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। কারণ, ভিসা চালু হলেও লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অন্যান্য দেশগুলো যেখানে ই-ভিসা দিচ্ছে, কিছু দেশে তো ভিসাই লাগে না।’ তিনি বলেন, ভারতের পরিবর্তে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে বাংলাদেশিরা ভ্রমণ করছেন। ভারতের পাশাপাশি দুবাই ও ভিয়েতনামসহ কিছু দেশে ভিসা বন্ধ থাকায় ওই দেশগুলোতে পর্যটক বেড়েছে। ইদানীং চীন ভ্রমণের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে, তবে তাঁদের অধিকাংশ আবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন।
শুধু বিদেশ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও পরিবর্তন এসেছে। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সাজেক, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, সুনামগঞ্জের হাওর, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান পর্যটন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার স্ট্রিমকে বলেন, ‘ভারতের ভিসা বন্ধের কারণে কক্সবাজারে পর্যটক বেড়েছে, এবং এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ভিসা চালু হওয়ার পর আবারও পর্যটক কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, উত্তরবঙ্গের পর্যটকরা সাধারণত ভারতের দিকে চলে যান।’
পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ভারত পুনরায় ভিসা চালু করায় বাংলাদেশিদের একটি অংশ আবার ভারতমুখী হবে। বিশেষ করে যাঁদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল অথবা যারা কম খরচে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কেনাকাটা ও স্বল্প সময়ের ভ্রমণ করতে চান, তাঁরা দ্রুত ভারত সফরে আগ্রহী হবেন। তবে তাঁদের মতে, গত দুই বছরে যাঁরা নতুন গন্তব্য আবিষ্কার করেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ ভবিষ্যতেও সেই দেশগুলোতে যেতে আগ্রহী থাকবেন। ফলে ভারতের সঙ্গে বিকল্প গন্তব্যগুলোর প্রতিযোগিতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিওএবি) পরিচালক মো. মিজানুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘ভারতীয় পর্যটকদের অনেকেই দেশের ভেতরে ট্যুর করেছেন। গত বছরেও দেশের ভেতরে ট্যুরিজম জমজমাট ছিল। পার্বত্য অঞ্চলে ভালো ট্যুর হয়েছে, টাঙ্গুয়ার হাওরও গত বছর ভালো করেছে। সিলেটেও মানুষ গেছে, আর কক্সবাজারে প্রচুর চাপ ছিল। এর মূল কারণ ভারতের ভিসা বন্ধ থাকা। কারণ মানুষ চিন্তা করে যে একই খরচে কক্সবাজারের পরিবর্তে কলকাতা ঘুরে আসা যায়। আর ভারতে সারা বছর পর্যটন চালু থাকে।’
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক বোরহান উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধের কারণে পর্যটকদের মধ্যে নতুন প্রবণতা এসেছে, এটি সত্য। তবে সেটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এটি যাচাই-বাছাইয়ে ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ করা হচ্ছে। সেটি হয়ে গেলে বাস্তব চিত্র বের হয়ে আসবে।’