Image description

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের চীন সফরকে বিশ্লেষণ করেছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। তা নিয়ে তিনি অনলাইন ফরেন পলিসির সাপ্তাহিক সাউথ এশিয়া ব্রিফে লিখেছেন।

এতে বাংলাদেশ-চীন-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কি হবে তা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। বাংলাদেশ কি চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে? ভারতের সঙ্গে অবনতিশীল সম্পর্কের কি হবে? এসব প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তিনি বাংলাদেশ অংশে লিখেছেন, চীন সফরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় যাত্রাবিরতি করেন। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর।

প্রথম নজরে তারেক রহমানের এই সফরকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কারণ চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা দেশ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। কিন্তু এই সফরটি কেবল আরেকটি উচ্চপর্যায়ের সফরই নয়; এটি ভারতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারত একদিকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ হিসেবে ঘোষণা করে। গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে সেই সফর হয়। তবে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের পর দুই দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গড়ে তোলা হবে।

সফরকালে ঘোষিত একাধিক চুক্তি থেকে বোঝা যায়, দুই দেশের সহযোগিতা এখন আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ও চীন যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর আধুনিকীকরণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দুর্বল বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে চীনা কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এছাড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সাধারণত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোর মধ্যেই এ ধরনের ব্যবস্থা চালু থাকে। এমনকি একটি সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা চীনের সফট পাওয়ার সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে বেইজিং বাংলাদেশকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) যোগদানের ক্ষেত্রে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই ঘটনাগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অনেকেই ধারণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কিছু নেতা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নত হলে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সহযোগিতা সহজ হবে।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ক্ষমতায় এসেই এত দ্রুত চীন সফরে গেলেন, তারও যৌক্তিক কারণ রয়েছে। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সফল অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ধীরগতিতে চলছে। দীর্ঘমেয়াদে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আরও বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের খুব বেশি গভীর ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক অংশীদার নেই। সেই দিক থেকে চীনের মতো বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এবং ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব বিদ্যমান। ফলে তারেক রহমানের এই সফর নতুন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে, এই সময়ে ভারত সফরে গেলে তা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর একটি কৌশলগত হতাশা। কারণ ধারণা করা হয়, বিএনপির নির্বাচনী জয়কে নীরবে স্বাগত জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। ভারতের কাছে বিএনপির সাবেক মিত্র ও বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বিএনপি অধিক গ্রহণযোগ্য। ভারত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইচ্ছারও ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু চীন সফর দেখিয়ে দিল, সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

তবে এই সফরের ফলে ঢাকার জন্যও কিছু ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছে। মূলত এটি এক ধরনের জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া। কিন্তু যদি বাংলাদেশকে চীনের খুব ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয়, তাহলে সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের নেতারা জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে আসছেন, যদিও শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা বাস্তবে ভারতের দিকে স্পষ্টভাবে ঝুঁকে ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে আবারও সেই নীতিকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে। তবে তার জন্য সব বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

শীর্ষনিউজ