গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে উদ্বোধনের আগেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সেই ফাটল ঢাকতে সিমেন্ট দিয়ে সংস্কার ও নতুন প্লাস্টারের কাজ চলছে। প্রকল্প শুরুর প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এবং উদ্বোধনের আগেই ফাটল দেখা দেওয়ায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও প্লাস্টারে ছোট-বড় ফাটল স্পষ্ট। কোথাও পুরোনো প্লাস্টার কেটে নতুন করে সিমেন্ট লাগানো হচ্ছে, আবার কোথাও নতুন প্লাস্টার দিয়ে সংস্কার করা হচ্ছে। উদ্বোধনের আগেই এমন মেরামত কাজ ভবনের নির্মাণের মান নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বাধ্যতামূলক তথ্যফলক বা সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও মসজিদ প্রাঙ্গণে এমন কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়নকাল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সাধারণ মানুষের অজানাই রয়ে গেছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে কোটালীপাড়ায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় সাত বছরেও প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়নি।
গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরোনো ভূমি অফিস অপসারণে বিলম্ব এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে কাজ ছেড়ে দেয়। পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেড’কে নতুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রকল্পটি শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ধীরগতির কাজ এবং কার্যকর তদারকির অভাবে প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়েছে। উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় তারা ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেডের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ বলেন, কলাম বা বিমে কোনো কাঠামোগত সমস্যা নেই। প্লাস্টারে ফাটল দেখা দিয়েছে, যা মেরামত করা সম্ভব এবং আমরা তা করছি। সাইটসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৩ সালের জুনে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করি। বর্তমানে আমাদের প্রায় তিন কোটি টাকার বিল বকেয়া রয়েছে। বিল পরিশোধ করা হলে দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাগুফতা হক বলেন, ফাটলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমি এখানে যোগদানের পর থেকেই মসজিদটিকে একই অবস্থায় দেখছি। আগের জেলা প্রশাসকও ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য একাধিকবার তাগিদ দিয়েছিলেন।
গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম খান বলেন, জুন মাসের ব্যস্ততার কারণে এখনো সরেজমিনে যেতে পারিনি। ঠিকাদারের প্রকৌশলীকে ফাটলগুলো মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যস্ততা শেষে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
কোটালীপাড়া কল্যাণ সংঘের সভাপতি সোহেল শেখ বলেন, প্রায় সাত বছরের বিলম্ব, দুই দফা ঠিকাদার পরিবর্তন, উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল এবং প্রকল্পের তথ্যফলকের অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে এই প্রকল্প সরকারি কাজের গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। শুধু ফাটল ঢেকে নয়, স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের প্রকৃত মান যাচাই করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাই।