ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা ও শিশুদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার সুস্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে নিজেদের দায়মুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক ভারতীয় বিচারপতি এস মুরালিধর। গত সপ্তাহে ওড়িশা হাইকোর্টের সাবেক এই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে শিশু হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ২০২১ সালের মে মাসে এই স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করে। গত বছরের নভেম্বরে এই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি মুরালিধর। সম্প্রতি 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তদন্তের বিস্তারিত তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন।
শিশু হত্যার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং ৪৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছে। ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজায় বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঙ্গু শিশু বাস করছে এবং প্রায় ৫৮ হাজার শিশু এতিম হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কর্মকাণ্ড গাজায় ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ও উত্তরসূরি ধ্বংস করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। কমিশন অবিলম্বে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ, অবাধ মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
যেভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়
সাক্ষাৎকারে বিচারপতি মুরালিধর জানান, ইসরায়েল মূলত দুটি পদ্ধতিতে শিশুদের ওপর হামলা চালায়। প্রথমত, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়, যেখানে প্রচুর শিশু হতাহত হওয়া অনিবার্য। দ্বিতীয়ত, কোয়াডকপ্টার, ড্রোন এবং স্নাইপার ব্যবহার করে সুনির্দিষ্টভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
তিনি জানান, কোয়াডকপ্টারগুলোতে থাকা থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরার মাধ্যমে অপারেটররা স্পষ্টভাবে শিশুদের শনাক্ত করতে পারেন। মুরালিধর উদাহরণ হিসেবে জানান, ১০ দিন বয়সী এক শিশুর মাথায় কোয়াডকপ্টার থেকে গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বড়দের সাথে থাকা শিশুদের বেছে বেছে গুলি করার অনেক নজির পাওয়া গেছে, যেখানে বড়দের ছেড়ে বাচ্চাদের গুলি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের সাক্ষ্যের বরাতে তিনি জানান, শিশুদের মাথা ও ঘাড়ে কিউব আকৃতির ছররা গুলি দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যভেদ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই
তদন্ত চলাকালীন কমিশন ইসরায়েলের কাছে তথ্য চেয়ে ১৩টি অনুরোধ পাঠালেও কোনোটিরই জবাব পায়নি। এ অবস্থায় কমিশন ফরেনসিক সরঞ্জাম, ভূ-অবস্থান (জিওলোকেশন) এবং ক্রোনো-লোকেশন পদ্ধতিসহ বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করেছে।
বিচারপতি মুরালিধর বলেন, 'আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসরায়েলি সেনারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অপরাধের অসংখ্য ভিডিও পোস্ট করেছে।' প্রতিবেদন প্রকাশের আগে খসড়াটি ইসরায়েলের কাছে পাঠানো হলে তারা ১৮ পৃষ্ঠার একটি খণ্ডনমূলক বিবৃতি দিলেও সেখানে ভিডিও বা সাক্ষ্যপ্রমাণের সত্যতা অস্বীকার করেনি।
তিনি বলেন, 'ইসরায়েল ১০, ১২ বা ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও নির্বিচারে "সন্ত্রাসী" হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। কোনো শিশুকে একবার সন্ত্রাসী তকমা দেওয়ার পর ইসরায়েলি সেনারা তাকে হত্যার জন্য অন্য কোনো কারণ খোঁজার প্রয়োজন বোধ করে না। ইসরায়েলি সেনারা টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছে, তাদের কমান্ডাররা তাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন যে—লক্ষ্যবস্তুর বয়স যাই হোক না কেন, তাকে হত্যা করতে হবে। এ কাজের জন্য তাদের প্রশংসিতও করা হয়।'
গণহত্যা ও পরিকাঠামো ধ্বংস
প্রতিবেদনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মুরালিধর জানান, এখানে কেবল হত্যাকাণ্ডই ঘটছে না; এর পাশাপাশি চলছে কৃষিজমি দখল। ধ্বংস করা হয়েছে মোট স্কুলের ৯৭ শতাংশ এবং ৩৮টির মধ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সঙ্গে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে শিশু ও নবজাতক চিকিৎসাকেন্দ্রেও।
মুরালিধর বলেন, 'আপনাকে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে আসা উস্কানিমূলক বক্তব্যের দিকেও তাকাতে হবে… ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার ঠিক দুদিন পর নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) ডেপুটি স্পিকার নিসিম ভাতুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন: "গাজাকে মুছে দাও… সেখানে একটা শিশুকেও বাঁচিয়ে রেখো না। বাকিদের সবাইকে তাড়িয়ে দাও… যাতে তারা আর কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াতে না পারে।"'
আন্তর্জাতিক দায় ও ভারতের অবস্থান
বর্তমানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) প্রায় ৬ হাজার ফরাসি, ২ হাজার ব্রিটিশ এবং ৭০০ অস্ট্রেলীয় নাগরিক কাজ করছেন। বিচারপতি মুরালিধর মনে করেন, এসব দেশ রোম স্ট্যাটিউটের স্বাক্ষরকারী হওয়ায় তাদের নিজস্ব নাগরিকদের এই নৃশংসতার জন্য বিচার করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
একই সাথে তিনি ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করারও আহ্বান জানান। ভারতও ইসরায়েলে ছোট অস্ত্র রপ্তানি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করার দায় থেকে কোনো দেশই মুক্ত থাকতে পারে না।
বিচারপতি মুরালিধর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বলেন, 'কুলভূষণ যাদবকে যখন অন্যায়ভাবে বন্দি করা হয়েছিল এবং পাকিস্তানে ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, তখন আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়েছিলাম… ওয়াল স্ট্রিটের র্যাংকিং কিংবা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক আইন চাই। কিন্তু যখনই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রসঙ্গ আসে, রাজনীতিবিদরা দাবি করেন যে এটি আমাদের প্রথার বাইরে, এটি "বিদেশি"।'
তিনি বলেন, 'আমি সত্যিই চাই ভারত সরকার তার পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকাক এবং প্রশ্ন করুক: আমরা কি মৌলিক মানবিক নীতিগুলোকে এভাবে জলাঞ্জলি দিতে দেব? এত স্পষ্ট প্রমাণের পরও যদি আমরা পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতের কাছে আমরা নিজেদের দায়মুক্ত করতে পারব না।'