পরপর দুইটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ভেনিজুয়েলা। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫। ভয়ংকর এই ভূমিকম্পের জেরে রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আতঙ্কে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ল্যাটিন আমেরিকায় আঘাত হানা এটিই শতাব্দীর জোড়া ভূমিকম্প। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল) ভূমিকম্প আঘাত হানে। জোড়া ভূমিকম্পের পরও ৩০ বার কেঁপে ওঠে ভেনিজুয়েলা। মৃতের সংখ্যা ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে একটি মার্কিন সংস্থা জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার থেকে ১ লাখে পৌঁছাতে পারে। দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
ভেনিজুয়েলার একাংশ ধ্বংসস্তূপ
গতকাল ভোরে পরপর দুটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে কারকাসসহ ভেনিজুয়েলার একাধিক এলাকা। মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, জোড়া এই ভূমিকম্পের উত্পত্তি স্থল ভেনিজুয়েলার ক্যারিবীয় উপকূলবর্তী মোরন শহরের পশ্চিমে। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার গভীরে। প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। ঠিক তার প্রায় ৩৯ সেকেন্ডের মধ্যে আরো একটি শাক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটির উত্স্থলও ঐ একই জায়গায়। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। দ্বিতীয় শক্তিশালী ঐ ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। ভয়ংকর এই ঘটনায় বহু মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানানো হয়নি। তবে জানা গেছে, কারাকাসসহ একাধিক এলাকায় ভেঙে পড়েছে বহু বাড়িঘর। ছাদহীন বহু পরিবার।
সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, কারাকাসে বহু ভবন পেন্ডুলামের মতো দুলছে। আতঙ্কে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসছেন বাসিন্দারা। কোথাও কোথাও ধূলিসাত্ হয়ে যায় বাড়িঘর। ভেঙে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি। ধ্বংসস্তূপের জেরে ফেটে গেছে একাধিক রাস্তা। জোড়া ভূমিকম্পের পরই কারাকাসের বহু এলাকায় বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে বহু মোবাইল ফোনের টাওয়ারও। ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। যুদ্ধকালীন তত্পরতায় চলছে উদ্ধারকাজ। জাতির উদ্দেশে ভাষণে ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রুদ্রিগেজ জানান, ভূমিকম্পের ফলে দেশের বহু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তথ্য তিনি উল্লেখ করেনি।
ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর, জরুরি অবস্থা
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে রাজধানী কারাকাস এবং বন্দরশহর লা গুয়াইরায়। বহু ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে দুই শহরে। রানওয়ে ভেঙে ভিতরে ঢুকে যাওয়ায় মূল বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে বহু প্রাণহানির আশঙ্কা করছে আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা (ইউএসজিএস)। তাদের ধারণা, জোড়া কম্পনে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। দেশে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পরেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে প্রশাসন। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রুদ্রিগেজ ডেলসি দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিমধ্যেই উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কারাকাসসহ ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে শিশু এবং বৃদ্ধদের নিরাপদে বাইরে বার করে আনা হোক। ভূতত্ত্ববিদেরা বলছেন, এমন জোরালো মাত্রার ভূমিকম্প গত ১০০ বছরে দেখেনি ভেনিজুয়েলা। লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ‘হোটেল এডুয়ার্ডস’এর ভূমিকম্পে ধসে পড়ার দৃশ্য বিশ্লেষণ করেছিল বিবিসি ভেরিফাই। একসময় এটি ১০ তলা উঁচু একটি ভবন ছিল। আগে ও পরের ছবিগুলো থেকে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে। ভবনটি এখন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি হলো কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত এই লা গুয়াইরা।
ভূমিকম্পের কারণ কী ছিল?
ভেনিজুয়েলা এমন একটি ভূকম্পন সক্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান এই দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে দ্বিতীয় এবং তুলনামূলকভাবে বড় ভূমিকম্পটি এই প্লেটগুলোর সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’র ফলে ঘটেছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যখন ফল্ট বা প্লেটগুলোর মধ্যকার ফাটলগুলো অনুভূমিকভাবে সরে যায়। এই সরে যাওয়া দ্রুত ঘটলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। ইউএসজিএস বলেছে, আজকের এই দুটি ভূমিকম্প সম্ভবত একটি জটিল ভঙ্গুরতা-বিস্তার প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়। তারা আরো যোগ করেছে, বড় ধরনের আফটারশকের শঙ্কা এখনো রয়েছে।