Image description

১১ মাস বয়সী আবু তালহার জীবনের শুরুটা বেদনায় মোড়া। জন্মের মাত্র ছয় দিন পরই মাকে হারায়।

এর পর থেকে দাদি, ফুফু, বাবা ও মামার স্নেহে বড় হয়ে উঠছিল শিশুটি। কিন্তু হামের সংক্রমণ তার পরিবারকে এমন এক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়, যেখানে রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি যুদ্ধ করতে হয়েছে অর্থকষ্টের সঙ্গেও।

ঢাকার শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট তালহা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। নাকে অক্সিজেনের নল, নরম হাতে ক্যানুলা।

পাশে বসে সেবা করছেন ফুফু শারমিন শিলা।

শারমিন জানান, জন্মের ছয় দিনের মাথায় তালহার মা মারা যান। এর পর থেকে পরিবারের সবাই মিলে তাকে লালন-পালন করছে। কিন্তু হামে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে।

প্রচণ্ড জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতায় তাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নিতে হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার তালহার মামা ওমর ফারুকের সঙ্গে কথা হয়। পেশায় তিনি গাড়িচালক। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। পরে স্থানীয় হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঢাকার শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসতে হয়।

ময়মনসিংহ ও ঢাকা মিলিয়ে প্রায় ৪২ দিন হাসপাতালে ছিলাম। আল্লাহর রহমতে এখন অনেকটা সুস্থ।’

এই ৪২ দিনের চিকিৎসায় ছোটাছুটিতে শুধু শারীরিক কষ্টই হয়নি, ছিল আর্থিক দুর্ভোগও। ওমর ফারুক জানান, তালহার চিকিৎসায় প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরিবারের সঞ্চয়, বাবার আয়, দাদার সহায়তা এবং আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় এই অর্থ জোগাড় হয়েছে। তিনি বলেন, যা ছিল প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। তখন একটাই চিন্তা ছিল—বাচ্চাটিকে বাঁচাতে হবে।

শুধু তালহা নয়, রাজধানীর শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে এমন অসংখ্য পরিবারের দেখা মিলেছে, যাদের কাছে রোগের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে চিকিৎসার ব্যয়। এর মধ্যেই এক দিনে আরো ৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সাড়ে ৯ মাস বয়সী মেহেরজানের বাবা মেহেদী  হাসান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। ঈদের আগে মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। কয়েক দিন পর হামের লক্ষণ দেখা দিলে মেয়েকে ঢাকার শিশু হাসপাতালে ভর্তি করান।

মেহেদী হাসান বলেন, প্রথম কয়েক দিন খুব কষ্ট হয়েছে। অক্সিজেন দিতে হয়েছে, বিভিন্ন পরীক্ষা হয়েছে। প্রায় ১২ দিন হাসপাতালে ছিলাম। ওষুধ, থাকা-খাওয়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ। হাসপাতালে মেহেদী দেখেছেন আরো নির্মম বাস্তবতা। তিনি বলেন, একজন বাবাকে দেখেছি সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের ৮০ হাজার টাকার ফ্রিজ ৪০ হাজারে বিক্রি করে দিতে। চিকিৎসার কাছে সবাই অসহায়।

কিন্তু সবাই তালহা ও মেহেরজানের মতো সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেনি। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ নোমানের আট মাস বয়সী মেয়ে জান্নাতকে বাঁচানো যায়নি। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতায় তাকে ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ১৩ মে সেখানে মারা যায় শিশুটি। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বুটিক কারিগর। তিনি বলেন, আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি ভাই! মেয়েকে বাঁচাতে যা ছিল, সব খরচ করেছি। অনেক ধার করেছি। লাখ টাকার বেশি ঋণ। তবু মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না!

একই কষ্ট তাসমিদের বাবা মো. নয়নের। সামান্য আয়ের চাকরি করতেন তিনি। সন্তানের চিকিৎসার জন্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, এমনকি স্থানীয় দোকানদারের কাছ থেকেও ধার করেছেন। হাসপাতালে যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা আর খাবারের খরচ মিলিয়ে কয়েক দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। তবু শেষ রক্ষা হয়নি।

হামে মারা যাওয়া অন্তত ১০টি শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবার গল্পই এক। সন্তানকে বাঁচাতে কেউ গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন এনজিও বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি : হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬০৫ শিশু। নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৩ শিশুর। সব মিলিয়ে মৃত্যু ৬৯৮ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরো ৮৯৩ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এই সময়ে নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫২ জন। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৯৬ হাজার ৬৫৩। এ পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৪৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮০ হাজার ৪৯৭ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৭৬ হাজার ৭৮৮ জন।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কমপ্লিকেটেড মিজেলস বা হাম-পরবর্তী জটিলতা। তিনি বলেন, শিশুরা এখন শুধু হাম নিয়ে আসছে না, তারা নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত ভর্তি রাখতে হচ্ছে।

তিনি জানান, গুরুতর রোগীদের জন্য ১৪ বেডের বিশেষায়িত আইসিইউ চালু করা হয়েছে, যা সব সময় পূর্ণ থাকছে।

ডা. আতিকুল বলেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউ-সংকট থাকায় রোগীরা ঢাকায় আসছে। সময়মতো আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট পেলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।

হামের চিকিৎসা ব্যয় বিপুল : হামের চিকিৎসায় গড় ব্যয় নিয়ে এখনো কোনো সরকারি গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নিতে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। জটিলতা থাকলে তা ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে যাতায়াত, খাবার, স্থানীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়।

অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গড়ে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। কোনো শিশুর পিআইসিইউ প্রয়োজন হলে খরচ তিন লাখ টাকারও বেশি হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু একটি সংক্রামক রোগ নয়, এটি অনেক পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে প্রায়ই পরিবারের একজন সদস্যকে কাজ ছেড়ে হাসপাতালে থাকতে হয়। বাড়ে যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের খরচ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চিকিৎসা খরচের ভয়ে অনেক গরিব পরিবার শুরুতে হাসপাতালে যেতে সাহস পায় না। যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তারা ঘটি-বাটি বিক্রি করে হাসপাতালে ছুটে আসে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।