মারিয়াম আলী
প্যারিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সাধারণত যেমন তাপমাত্রা দেখা যায়, ইউরোপেও এখন ঠিক তেমন আবহাওয়া বিরাজ করছে। তীব্র দাবদাহে পুড়ছে ইউরোপের বড় একটি অংশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালির বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে।
প্রচণ্ড গরমে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেখা দিয়েছে দাবানলের আশঙ্কা। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থা। পরিস্থিতি সামলাতে বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফ্রান্সের ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা এলাকাগুলোতে সাময়িকভাবে মদ কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
জার্মানিতে দেশজুড়ে তাপ-সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্পেনের মাদ্রিদে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি ছাড়ানোয় ফুটবল বিশ্বকাপের একটি ‘ফ্যান জোন’ প্রদর্শনী বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপে কেন এই তীব্র গরম?
ইউরোপের এই অস্বাভাবিক গরমের পেছনে রয়েছে ‘হিট ডোম’ বা তাপ-বলয়। বায়ুমণ্ডলের উচ্চচাপের কারণে পশ্চিম ইউরোপের আকাশে গরম বাতাস আটকে আছে। এর ফলে আকাশ মেঘমুক্ত থাকছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কড়া রোদ পড়ছে। উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা গরম বাতাস এই তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সসংলগ্ন সমুদ্রের পানিও অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠেছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে রাতেও তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। স্পেনের সমুদ্র উপকূলের পানিও রেকর্ড পরিমাণে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে দেশটির বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপারনিকাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দৈনিক গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই সময়ের আগে এই দাবদাহ শুরু হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ এখন ইউরোপ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এখানে প্রতি দশকে তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, তা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির দ্বিগুণেরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন ঘনঘন তীব্র দাবদাহ হানা দিচ্ছে এবং এর স্থায়িত্বও বাড়ছে।
ইউরোপের শহরগুলো কতটা উত্তপ্ত?
ইউরোপের এই গরম কতটা ভয়াবহ, তা বোঝাতে একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে আলজাজিরা। তারা গত ২৪ জুন ইউরোপের পাঁচটি রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বিশ্লেষণ করেছে।
এরপর সেই তাপমাত্রার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার তপ্ত শহরগুলোর তুলনা করেছে। মূলত যেসব অঞ্চলে সচরাচর তীব্র গরম পড়ে, সেসব শহরের তুলনায় ইউরোপের শহরগুলো এখন কতটা উত্তপ্ত, সেটিই এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কেন এই অসহনীয় পরিস্থিতি?
ইউরোপ এই চরম তাপপ্রবাহের মুখে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখানকার বাড়িঘর এবং অবকাঠামো দীর্ঘস্থায়ী গরম সহ্য করার মতো করে তৈরি করা হয়নি। এ ছাড়া ইউরোপের মাত্র ২০ শতাংশ বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি রয়েছে।
নিচের চিত্রে বিশ্বের অন্যান্য শহরের তুলনায় ইউরোপের শহরগুলোর আজকের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
তাপমাত্রা কীভাবে মাপা হয়?
আমরা খবরের কাগজে বা ফোনের অ্যাপে যে তাপমাত্রা দেখি, তা মূলত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা আবহাওয়া কেন্দ্রগুলোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। সঠিক মান পাওয়ার জন্য এসব কেন্দ্রে বিশেষ ধরনের ‘প্লাটিনাম রেজিস্ট্যান্স থার্মোমিটার’ ব্যবহার করা হয়।

রোদ থেকে বাঁচাতে থার্মোমিটারগুলো ‘স্টিভেনসন স্ক্রিন’ নামক এক ধরনের ছায়াযুক্ত বাক্সের ভেতর রাখা হয়। মাটি থেকে সাধারণত ১ দশমিক ২৫ থেকে ২ মিটার (৪ থেকে ৬ দশমিক ৫ ফুট) উঁচুতে তাপমাত্রা মাপা হয়। এর ফলে মানুষ বাস্তবে যে তাপমাত্রা অনুভব করে, তার একটি সঠিক চিত্র পাওয়া যায়।
তাপমাত্রা মাপার জন্য সেলসিয়াস ও ফারেনহাইট—এই দুটি পদ্ধতি সবচেয়ে জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ফারেনহাইট পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই সেলসিয়াস পদ্ধতি প্রচলিত।
সুইডিশ জ্যোতির্বিদ অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসের নামানুসারে এই পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৭৪২ সালে পানির হিমাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কের ওপর ভিত্তি করে ০ থেকে ১০০ ডিগ্রির এই স্কেলটি আবিষ্কার করেন।
পূর্বাভাসের চেয়েও কেন বেশি গরম অনুভূত হয়?
বাতাসে বিদ্যমান তাপমাত্রা আর শরীরের অনুভূত তাপমাত্রা সবসময় এক হয় না। এ কারণেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ‘ফিলস লাইক’ বা ‘অনুভূত তাপমাত্রা’র কথা বলা হয়। বাতাসের আর্দ্রতা, গতিবেগ এবং রোদের প্রখরতা বিবেচনা করে এই তাপমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
আর্দ্রতা: বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণকে আর্দ্রতা বলে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে না এবং বেশি গরম লাগে।
বাতাসের গতি: প্রচণ্ড গরমে হালকা বাতাসও শরীর থেকে ঘাম শুকাতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীর কিছুটা শীতল হয়।
রোদের প্রখরতা: থার্মোমিটারের রিডিং একই থাকলেও সরাসরি সূর্যের আলোতে বেশি তাপ অনুভূত হয়। এ কারণেই সরাসরি রোদের চেয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে বেশি আরাম লাগে।
লেখক পরিচিতি
মারিয়াম আলী আল-জাজিরার ‘এজে ল্যাবস ইন্টারঅ্যাকটিভ’ দলের একজন সদস্য। তিনি পাকিস্তানের করাচি থেকে কাজ করেন। বৈশ্বিক সংঘাত, পরিবর্তনশীল বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং জলবায়ু ও জ্বালানি পরিস্থিতির বিবর্তন নিয়ে তিনি তথ্যভিত্তিক ও সৃজনশীল প্রতিবেদন তৈরি করেন।
২০২৫ সালে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবৈধ হামলার একটি মানচিত্র তৈরির কাজ করেছেন। আলজাজিরায় যোগ দেওয়ার আগে মারিয়াম ডন মিডিয়া গ্রুপের সহযোগী ক্রিয়েটিভ ম্যানেজার ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তান’-এর হয়েও কাজ করেছেন।