সুইজারল্যান্ডের রিসোর্টে এক আলোচনা হয়েছিল। সেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির জটিলতা নিয়ে একটি মন্তব্য করেন। সেখানে উল্লেখিত হয়েছিল, ভারতীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রী এবং পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মজা করে বলি, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুজন মানুষের একজন ভারতীয়, আরেকজন পাকিস্তানি। ভারতীয়জন আমার স্ত্রী, আর পাকিস্তানি হলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।’
সম্প্রতি ফিল্ড মার্শাল মুনিরের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বিদেশি প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এই বাস্তবতা ভারতের সেই প্রচেষ্টার বিপরীত চিত্র তুলে ধরে, যার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পাহেলগাম হামলার পর পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য নয়াদিল্লি ৩২টি দেশে ৫৯ জন রাজনীতিক পাঠিয়েছিল। কিন্তু চার দিনের সংঘাত শেষে পাকিস্তান শুধু তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থান ধরে রাখতেই সক্ষম হয়নি, বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। ভৌগোলিক অবস্থান, কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তা-সম্পর্কিত অংশীদারত্বের কারণে ইসলামাবাদ আজও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।
ভারতের প্রচেষ্টা শুধু কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়নি, তথ্যযুদ্ধেও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ২০২৫ সালের সংকটের সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং এমনকি এক ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেন যে ভারত একাধিক যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। পাকিস্তান এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে, যে বড় প্রতিপক্ষের চাপ মোকাবিলা করতে এবং তার মূল্য আদায় করতে সক্ষম।
আসলে এই সংকটের সময় তথ্যযুদ্ধ প্রায় সামরিক সংঘর্ষের সমান গুরুত্ব পেয়েছিল। ভারতীয় টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক দাবি করা হচ্ছিল—করাচি বন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে, লাহোর দখল হয়েছে, ইসলামাবাদ ভেঙে পড়ছে, পাকিস্তানের নেতারা গ্রেপ্তার হয়েছেন কিংবা আত্মগোপনে গেছেন।
পরে এসব দাবির অনেকগুলোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন ধারণা তৈরি হয় যে এই প্রচারণা বাস্তব তথ্যের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বেশি পরিচালিত হয়েছিল। ভারত বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিল যে সমস্যার মূল উৎস পাকিস্তান। কিন্তু বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে অধিকাংশ দেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো পক্ষ নিতে আগ্রহী নয়, যদি না তাদের নিজস্ব স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকে।
বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি
চীন পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভরসা হিসেবে রয়ে গেছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর মাধ্যমে বেইজিং পাকিস্তানের অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রও ফিল্ড মার্শাল মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে। ফলে ভারত যখন কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করেছে, তখন ইসলামাবাদের হাতে কৌশলগতভাবে চলার জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক তাপমাত্রা একাই নির্ধারণ করে ভারত। কিন্তু নয়াদিল্লি কোনো আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলতে পারেনি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের জন্য নতুন আঞ্চলিক সুযোগ তৈরি হয়। ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। এতে বোঝা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ভারতের প্রভাব সর্বশক্তিমান নয়।
এদিকে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোও সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। তারা ভারত ও চীনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ও স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
মুসলিম বিশ্বেও পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী রয়েছে। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইসলামাবাদকে অতিরিক্ত কূটনৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।
পাকিস্তানের এই প্রভাব শুধু কূটনীতির কারণে নয়। শ্রমবাজার, জ্বালানি সহযোগিতা, নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সংযোগও এর পেছনে কাজ করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কথিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ পাকিস্তানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। একইভাবে তুরস্কের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা পাকিস্তানের কৌশলগত পরিসর বিস্তৃত করেছে এবং ইউরোপের বিস্তৃত প্রতিবেশ, কৃষ্ণসাগর অঞ্চল ও মধ্য এশিয়ায় তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে—যেখানে ভারতের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি
তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভারতের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়নি। ভারত বনাম পাকিস্তান—এই সরল বিভাজনের পরিবর্তে পশ্চিমা দেশগুলো পাকিস্তানকে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করেছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ছিল ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আফগানিস্তান, ইরান এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের গুরুত্বকে ভারতের অনুরোধে উপেক্ষা করতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত ছিল না।
একই সময়ে পাকিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্কও আরও গভীর হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০২৬ সালে মস্কো সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে যৌথ কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তাও পাকিস্তানকে ভারতীয় চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ফলে আর্থিক দুর্বলতাকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ কমে গিয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত ৭ বিলিয়ন ডলারের ‘এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ এবং পরবর্তী কিস্তিগুলো পাকিস্তানকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে আইএমএফ আরও প্রায় ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসী আয় পৌঁছায় প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে ‘ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সে’র (এফএটিএফ) গ্রে লিস্ট থেকে বেরিয়ে আসায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে পাকিস্তানের।
ভারতের প্রচেষ্টা কেন উল্টো ফল দিল
পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও ভারত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ব্যাপক বহুপাক্ষিক সমর্থন আদায় করতে পারেনি। জাতিসংঘের কাউন্টার-টেররিজম কমিটিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি দেখিয়েছে যে দেশটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাহেলগাম সংকট আবারও কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে—যা ভারত দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। পাকিস্তানকে নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলতে গিয়ে নয়াদিল্লি অনিচ্ছাকৃতভাবেই কাশ্মীর প্রশ্নে নতুন করে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ফলে কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার ক্ষেত্র আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিবৃতিতে কাশ্মীরের উল্লেখ দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যখন যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ককে ‘সত্যিকারের বন্ধুত্ব’ বলে উল্লেখ করেন, তখন ভারত জানায়, তাদের প্রত্যাশা অংশীদার দেশগুলো পাকিস্তানকে সীমান্তের সন্ত্রাসবাদ পরিত্যাগে চাপ দেবে।
২০২৬ সালের ২ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে কাশ্মীরের উল্লেখ ছিল। ভারত একে ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেয়। এর আগে ২৬ মে চীন-পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতেও কাশ্মীর প্রসঙ্গ উঠে আসে। ভারত এসব রাজনৈতিক মন্তব্য এবং ওই অঞ্চলে যৌথ প্রকল্পের বিরোধিতা করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই আপত্তির প্রভাব ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
তবে ভারতের বিচ্ছিন্নকরণ কৌশলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত অন্য জায়গায়। বর্তমানে অনেক বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষক পাকিস্তানকে এমন একটি কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে বর্ণনা করছেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সক্রিয়ভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। সফল বিচ্ছিন্নকরণ অভিযানের মধ্যে কোনো দেশকে সাধারণত এভাবে বর্ণনা করা হয় না।
ভারতের আরেকটি লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেটিও তেমন সমর্থন পায়নি। পাকিস্তান ২০০১ সালের পর থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ব্যাপক ত্যাগের কথা তুলে ধরেছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সও দেখিয়েছে যে পাকিস্তান নিজেই দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসবাদের বড় শিকার।
পাহেলগাম-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বর্তমান বিভক্ত ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে বিচ্ছিন্ন করে রাখা খুব কঠিন। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তাগত গুরুত্ব, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোকে সহজে একঘরে করা যায় না।
ভারত পাকিস্তানের কৌশলগত বিকল্পগুলো সংকুচিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রচেষ্টাই উল্টো প্রমাণ করেছে, কেন পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে রাখা এত কঠিন।
- লরি এ ওয়াটকিন্স: পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা
(ডন থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)