প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে একটি বেসরকারি সাবমেরিন কেবল কোম্পানির পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ‘পিএমও বাংলাদেশ-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ২.০’ নামের ওই পেজ থেকে সম্প্রতি একাধিক বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে খোলা ওই ফেসবুক পেজের পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘ভারতের ইন্টারনেট নির্ভরতা চিরতরে শেষ! ২ হাজার কোটি টাকায় কক্সবাজারে যুক্ত হচ্ছে নতুন মেগা সাবমেরিন ক্যাবল। কমবে ব্রডব্যান্ড ও এমবির দাম!’
এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা দেশে যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তার প্রায় ৪০% থেকে ৬০% আসে ভারত থেকে স্থলভাগের তার (ITC) দিয়ে। এই নির্ভরতার কারণে আমাদের ডেটা সিকিউরিটি যেমন ঝুঁকিতে থাকে, তেমনি ভারতের তার কাটলে আমাদের দেশেও ইন্টারনেট স্লো হয়ে যায়!’
পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘এই জিম্মিদশা কাটাতে দেশে ঘটল মেগা টেক-বিপ্লব: সরাসরি সিঙ্গাপুর কানেকশন: সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোর-এর সমন্বয়ে গঠিত প্রাইভেট কনসোর্টিয়াম (BPCS) এবং নোকিয়া মিলে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারে বসাচ্ছে দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল। এটি ভারত হয়ে নয়, সরাসরি মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে সিঙ্গাপুরের সাথে যুক্ত হবে!’
ভুয়া ফেসবুক পেজের সেই পোস্টে বলা হয়, ‘অবিশ্বাস্য স্পিড: এই ক্যাবল থেকে দেশ পাবে নতুন ৪৫,০০০ জিবিপিএস (Gbps) স্পিড। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ৩য় ক্যাবল সি-মি-উই ৬ (SEA-ME-WE-6)। দাম কমবে: ব্যান্ডউইথ আমদানি বন্ধ হওয়ায় বছরে শত কোটি ডলার বাঁচবে। পাইকারি পর্যায়ে ট্রান্সমিশন খরচ ৩৯% কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট বিলও অনেক কমে আসবে। একটি ক্যাবল কাটা পড়লে এখন আর দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট স্লো হবে না। উল্টো নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে আমরাই এখন নেপাল, ভুটান ও ভারতের সেভেন সিস্টার্সে ইন্টারনেট রপ্তানি করব!’
অনেকে এই ভুয়া পেজের পোস্টে না বুঝে সরকারকে ধন্যবাদও দিচ্ছেন। পেজের কমেন্টে অনেকে লিখছেন, ‘সরকারকে অনেক ধন্যবাদ বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।’ কেউ আবার লিখেছেন, ‘আপনার অদম্য শক্তি ও বুদ্ধিমত্তায় আমাদের বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ ওই সব কমেন্টে আবার ফেইক পেইজ থেকে প্রচারণার পক্ষের কমেন্টে ধন্যবাদও জানানো হচ্ছে।
যারা এই ফেইক পেজ বুঝতে পারছেন তারা আবার এই প্রচারণার সমালোচনাও করছেন। ‘পিএমও বাংলাদেশ-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ২.০’ নামের ওই ফেসবুক পেইজের স্ক্রিনশট নিজের আইডিতে শেয়ার দিয়ে একজন লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নামে ফেসবুক পেইজ খুলে আওয়ামী আমলের ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা ভারতবিরোধী পোস্ট দিচ্ছে। সামিট, মেটকো এগুলো সরাসরি আওয়ামী ইকোনমির অংশ ছিল। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে এখন হয়তো বিএনপির কেউ না কেউ এগুলোতে ঢুকেছে বা বেনিফিট নিচ্ছে। তাই বলে ফেইক পেইজ বানায় ব্যবসার প্রোপাগান্ডা? লাইক কমেন্ট করে অনেক ভারতবিরোধী আবার হাজার নেকিও কামিয়ে নিচ্ছে কমেন্টস থ্রেডে।’
বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকৃত পেজের নাম ‘PMO Bangladesh - প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’। পেজটি ভেরিফায়েড এবং সেখানে ২.০ শব্দ নেই। প্রকৃত পেজ ঘুরে দেখা গেছে, সেখান থেকে এধরনের কোনো পোস্ট দেওয়া হয়নি।
বেসরকারি সাবমেরিনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যান্ডউইথ আমদানির জন্য ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সামিট কমিউনিকেশন, মেটাকোর এবং সিডিনেটকে আলাদা সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেয়। পরে ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের জন্য তারা যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে কনসোর্টিয়াম করে কার্যক্রম শুরু করায় বেসরকারি খাতের সাবমেরিন কেবল প্রকল্প ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও বিতর্ক।
নতুন করে এই কেবলকে ঘিরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি। এই কনসোর্টিয়ামের চলমান সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের মূল কেবল ‘সিগমার (সিঙ্গাপুর-মায়ানমার)’ নির্মাণ করছে চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক’ (এইচএমএন)। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুও এই কেবল। বেসরকারি খাতের এই সাবমেরিন কেবলের প্রযুক্তিগত কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানকে ‘আনট্রাস্টেড’ উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একাধিকবার অনানুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল একাধিকবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া সিগমার সাবমেরিন কেবলটি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ফাইবার-অপটিক কেবল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্যাম্পানা গ্রুপের মালিকানাধীন এই কেবলের দুটি ল্যান্ডিং পয়েন্ট—সিঙ্গাপুরের টুয়াস এবং মিয়ানমারের থানলিন। বেসরকারি খাতের তিন প্রতিষ্ঠান সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোর প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্রাঞ্চ কেবল তৈরি করতে চায়, যা সিগমার কেবলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। বর্তমানে এই কেবল ‘ইউএমওও’ নামে পরিচিত।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র চালু করে ‘ক্লিন নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম’, যার লক্ষ্য ছিল চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে হুয়াওয়েকে বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোয় প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত রাখা। ‘ক্লিন কেবল ইনিশিয়েটিভ’ অনুযায়ী, চীন বা হুয়াওয়ে-সংশ্লিষ্ট কোনো সাবমেরিন কেবলকে মার্কিন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে দেওয়া হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এসব কেবলে গুপ্তচরবৃত্তি, ডেটা চুরি ও রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে। সাবমেরিন কেবলের মতো কোর নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে আন্তর্জাতিক ডেটা প্রবাহের নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততায় আপত্তি জানিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে এখনও দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মেলেনি। তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বারবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয়গুলো সায় দেয়নি।
শীর্ষনিউজ