মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নতুন করে তীব্র হুমকি দেওয়ার পর সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা বয়কট করে সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে গেছে ইরানের প্রতিনিধি দল।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) ইরানের প্রধান আলোচক ও দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনা বর্জনের কথা নিশ্চিত করেছেন।
নিজের দেশের অবস্থান পরিষ্কার করে গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের নির্দিষ্ট কিছু মূলনীতি রয়েছে এবং এ পর্যন্ত আমরা কখনোই আমেরিকানদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে সরাসরি সংলাপে অংশ নিতে চাইনি।’ মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ অনুরোধে ইরান কেবল পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হয়েছিল।
গালিবাফ বলেন যে, ‘আলোচনার মাঝপথে আমি জানতে পারি যে ট্রাম্প আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমাদের এই প্রতিনিধি দল এবং একই সঙ্গে ইরানের মূল ভূখণ্ডে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর তীব্র হুমকি দিয়েছেন।’ এই খবর পাওয়ার পরপরই তিনি মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
ইরানি স্পিকার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে ট্রাম্পের এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির শর্তগুলোকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।
তিনি জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ্য করে সভাকক্ষে বলেন যে, ‘আমি ভ্যান্সকে বলেছিলাম যে আমরা এখানে আলোচনার টেবিলে বসে আছি এবং আমাদের স্বাক্ষরিত সমঝোতার প্রথম ধারা অনুযায়ী যেকোনো পক্ষকে হুমকি দেওয়া বা সামরিক বলপ্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনাদের প্রেসিডেন্ট আজকেই নতুন করে আমাদের হুমকি দিয়েছেন।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ‘আপনাদের জেনে রাখা উচিত যে ইরান কখনোই কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের মুখে নতি স্বীকার করে আলোচনা পরিচালনা করে না।’
এই ঘটনার পরপরই ইরানের সম্পূর্ণ প্রতিনিধি দল তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠকটি সমাপ্ত ঘোষণা করে আলোচনার টেবিল থেকে একযোগে উঠে দাঁড়ায় এবং সভাকক্ষ ত্যাগ করে। গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ‘আমরা আলোচনা শেষ করে বৈঠক থেকে বের হয়ে এসেছি এবং সেখানে আর কখনোই ফিরে যাইনি।’ পরবর্তীতে মার্কিন প্রতিনিধি দল মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে আরেকটি জরুরি বৈঠক বসার জন্য জোরালো আকুতি জানালেও তেহরান ওয়াশিংটনের সেই প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেয়।
আমেরিকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর কাতার ও পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতাকারীরা ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তাদের নিজস্ব আবাসে এসে দেখা করেন। ইরানি স্পিকার মধ্যস্থতাকারীদের সাফ জানিয়ে দেন যে, ‘কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা আমাদের কাছে এসেছিলেন এবং আমরা তাদের বলেছি যে আমরা কেবল আপনাদের সঙ্গেই কথা বলব, তবে আমেরিকানদের সঙ্গে আমরা আর কোনো ধরনের সংলাপে বসব না।’
পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যকার এই অচলাবস্থা নিরসনে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা দীর্ঘ ৮০ মিনিট যাবত ইরানের সঙ্গে এক নিবিড় আলোচনা পরিচালনা করেন এবং সবশেষে একটি যৌথ কূটনৈতিক বিবৃতি প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যরাতে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি উল্লেখ করে এক চরম হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন যে ইরান যদি নতুন করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার কোনো চেষ্টা চালায় তবে পৃথিবীর বুকে ইরানের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।
তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে বলেন যে, ‘আপনারা আর নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগটুকুও পাবেন না এবং প্রয়োজনে আমরা নিজেরাই পুরো হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমাদের নিজেদের হাতে তুলে নেব।’ ওই একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে কথা বলা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও উদ্দেশ্য করে বলেন যে, ‘তার নিজের মুখ সামলে কথা বলা উচিত এবং তিনি যদি সোজা না হন তবে আমরা পুরো দেশের বাকি অংশও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেব।’
উল্লেখ্য যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর গত ১৪ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি বিশেষ ১৪ দফার শান্তি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ১৮ জুন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বা এমওইউ-টি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়।
এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে ছিল লেবানন যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর আমেরিকার আরোপিত দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া।
শীর্ষনিউজ/