ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকরা। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা ও গ্রীষ্মের তীব্র গরম উপেক্ষা করে দিনরাত অবস্থান কর্মসূচি পালন করে চলেছে দলটি।
রোববার (২১ জুন) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন-জিদের বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের মধ্যেও দ্বিতীয় দিনে তাদের সঙ্গে যোগ দেন বহু মানুষ। আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দিপকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা এই স্থান ত্যাগ করবেন না।
এই যুব আন্দোলনের মূল সূত্রপাত গত মে মাসে। ভারতের প্রধান বিচারপতি যুবসমাজকে তেলাপোকা বা ককরোচের সঙ্গে তুলনা করায় তা তরুণদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই ক্ষোভ থেকে বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা তরুণ অভিজিৎ দিপকে এক্সে লেখেন, ‘যদি সব ককরোচ একসঙ্গে জড়ো হয় তবে কেমন হবে?’ মুহূর্তে তার এই বার্তা ভাইরাল হয়ে যায়।
এরপর দিপকে একটি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট খোলেন এবং দলটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা অল্প কয়েকদিনে ২ কোটি ২০ লাখ (২২ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যায়। এমনকি এ সংখ্যা গত ১২ বছর ধরে ভারতের ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনুসারীর চেয়েও দ্বিগুণ হয়ে যায়।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ২৫ বছরের কম বয়সী। ঘন ঘন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নম্বরের অসঙ্গতির ঘটনা দেশটির তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি রয়েছে বেকার যুবকদের চাকরির চাহিদা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ ও উপহাসকে রাস্তায় নামিয়ে এনে ভারতীয় যুবকদের জমে থাকা ক্ষোভকে একটি রাজনৈতিক রূপ দিতে চলতি মাসের শুরুতে দেশে ফিরে আসেন দিপকে। গত ৬ জুন নয়াদিল্লিতে প্রথম বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর তিনি এই আন্দোলনকে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং নাগপুরসহ ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এরমধ্যে ব্যাপক ছাড়া ফেলেছে এ আন্দোলন।
রাজধানীর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে মধ্যরাতের পর দেখা যায়, ১৮ বছর বয়সি শচীন কুমার নামের এক পরীক্ষার্থী রাস্তায় শুয়ে তার নতুন বন্ধু শুভঙ্করের সঙ্গে ইয়ারফোনে গান শুনছেন। কুমার এক বছর কঠোর পড়াশোনা করে গত মাসে ভারতের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। পরে প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বাতিল করা হয় এ পরীক্ষা।
কুমার জানান, এই ঘটনা তার মনোবল ভেঙে দিয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা বিষণ্নতায় তলিয়ে গেলেও কেউ তা পাত্তা দিচ্ছে না। গত রোববার দেশজুড়ে প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী নতুন করে এই পরীক্ষায় অংশ নেয়, কিন্তু কুমার পরীক্ষায় না বসে বিক্ষোভস্থলে রয়ে যান। মূলত প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও সমালোচকরা একে স্রেফ একটি সাময়িক জোড়াতালির সমাধান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
চাঞ্চল্যের বিষয় হলো, দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে ভারতে এক ডজনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এ ঘটনা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে আরও জটিল করে তুলে।
শিক্ষার্থী কুমারের মতে, কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতার ওপর তার আর আস্থা নেই। অযোগ্য মন্ত্রীদের কারণে দেশের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। কুমার ও শুভঙ্কর দুজনের জন্যই এটি জীবনের প্রথম বিক্ষোভ এবং তারা বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন। সহজে বাড়ি ফিরবেন না।
ভারতীয় লাখ লাখ তরুণ ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী শাসনই দেখার সুযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে অন্য কোনো সরকার ভারতের শাসনক্ষমতায় আসতে পারেনি।
গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড দেওয়া বিক্ষোভস্থল থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেছে। এমনকি সাময়িকভাবে পানি ও খাবারের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছি। তবে এতেও দমে যাননি আন্দোলনকারীরা; মধ্যরাতের পর কাউকে দেখা গেছে হিপ-হপ গানের তালে নাচতে, আবার কেউ গোল হয়ে বসে মেতে উঠেছেন রাজনৈতিক আলোচনায়। শিক্ষামন্ত্রী যদি আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন তাহলে মোদির ১২ বছরের শাসনে প্রথম কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা হবে এটি। আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায়ে শতভাগ নিশ্চিত।
দিপকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে আমাদের ক্লান্ত করে ঘরে ফিরিয়ে দেবে, তবে তারা ভুল ভাবছে। আমরা এখানেই থাকব।’