ল্যাঙ্কিয়েন শহরে হামলার কয়েক দিন আগে স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তড়িঘড়ি করে রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে প্রসববেদনায় ছটফট করা নারী থেকে শুরু করে গুলির আঘাতে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরাও ছিলেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি শেষ রোগীকে বের করে নেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, সন্ধ্যায় একটি বোমা আঘাত হানে খালি হাসপাতালটিতে। এতে হাসপাতালের গুদামঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে একটি বড় গর্তের সৃষ্টি হয়।
ওই সময় দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনী বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নিজেদের এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে একটি পাল্টা অভিযান (কাউন্টার-অফেনসিভ) চালাচ্ছিল, যার ফলে আশপাশের এলাকায় লড়াই চলছিল। সেনাবাহিনী জংলেই রাজ্যের পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় একের পর এক শহর দখল করতে থাকে এবং বিরোধী যোদ্ধাদের ইথিওপিয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
বোমা হামলার পর, ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে শহরে মর্টার শেল আঘাত হানলে বাসিন্দারা আশপাশের জলাভূমিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে কিছু মানুষ ফিরে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দেন। হাসপাতালটি লুটপাট ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। টিকা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কোল্ড-চেইন স্টোরেজ ইউনিটে আগুন দেওয়া হয়েছিল। যানবাহনগুলো গুলিতে ঝাঁঝরা করে পার্টস খুলে নেওয়া হয়েছিল। সৌরবিদ্যুতে চালানো পানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছিল। স্থানীয় বাজারটি দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিনের শিটে পরিণত হয়েছিল এবং উপকণ্ঠের ঘরবাড়িগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গত এপ্রিলে ল্যাঙ্কিয়েন সফর করা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’ (এমএসএফ)-এর মিশনের উপপ্রধান এমারসন গোনো তার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলেন, ‘মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।’
জংলেইজুড়ে পাল্টা অভিযান
কর্তৃপক্ষ যেটিকে ‘অপারেশন এনডিউরিং পিস’ হিসেবে উল্লেখ করছে, তা শুরু হওয়ার পর থেকে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স’ (সিআইআর)-এর বিশ্লেষিত স্যাটেলাইট চিত্র, যাচাইকৃত ভিডিও, ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ জংলেই-এর একটি বড় অংশজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ইঙ্গিত দেয়, যা দীর্ঘকাল ধরে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ছিল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামরিক ও বিরোধী বাহিনী উভয়ের বিরুদ্ধেই গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। জংলেই-এর এই অঞ্চলটি নুয়ের জাতিগোষ্ঠীর একটি অংশের আবাসস্থল, যাদের প্রায়শই রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়।
আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অসংখ্য বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা বিশ্বাস করেন এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের জন্য সামরিক বাহিনী দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি লাখো মানুষকে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিআইআর-এর নথিভুক্ত ২৩টি ঘটনার নথিতে দেখা যায়, বাড়িঘর, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং বাজারসহ বেসামরিক স্থাপনাগুলো পুড়িয়ে দেওয়া ও লুট করা হয়েছে।
সিআইআর জানায়, এই ধ্বংসযজ্ঞ সম্ভবত আরো ব্যাপক এবং এটি একটি ‘পরিকল্পিত সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে’।
তবে সিআইআর-এর গবেষক কিরিয়া বোরাক জোর দিয়ে বলেছেন, স্যাটেলাইট চিত্র একা কোনো উদ্দেশ্য বা দায় নির্ধারণ করতে পারে না।
কিছু কর্মকর্তা এবং মানবিক সহায়তাকর্মী জংলেই-এর এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য সরকারি সেনা ও বিরোধী বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষকে দায়ী করেছেন। তবে বাসিন্দারা আল জাজিরাকে বলেছেন, তাদের গ্রামে যখন হামলা চালানো হয়, তখন সেখানে বিরোধী যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন না। এই এলাকায় যাতায়াত সীমিত থাকায় এসব বিবরণের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি কর্মকর্তারা এই প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। তবে আগের বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সামরিক অভিযানগুলো আত্মরক্ষার্থে চালানো হয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না।
রাজনৈতিক পটভূমি
২০২৫ সাল থেকে সহিংসতা তীব্র রূপ নেয়, যখন বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট রিয়েক মাচারকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মাচার এবং প্রেসিডেন্ট সালভা কির ২০১৩-২০১৮ সালের গৃহযুদ্ধে পরস্পরের বিরোধী পক্ষে ছিলেন, যে যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তারা একটি ভঙ্গুর ঐক্য সরকার গঠন করেন। সশস্ত্র বাহিনীকে একটি জাতীয় সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরের ধীরগতি এবং জাতীয় নির্বাচন বারবার পিছিয়ে যাওয়ার কারণে সেই চুক্তির বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়ে।
মাচারকে গ্রেপ্তারের পর সরকার গ্রামীণ অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে বিমান হামলা চালায়। মাচারের রাজনৈতিক দল শান্তি চুক্তিটিকে ‘মৃত’ ঘোষণা করে সামরিক ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা শুরু করে।
ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় সশস্ত্র যুবকদের সহায়তায় বিরোধী যোদ্ধারা জংলেই-এর বেশ কয়েকটি সামরিক গ্যারিসন দখল করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ জানুয়ারি সরকার পাল্টা অভিযানের ঘোষণা দেয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান পল নাং জাতীয় সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা ইউনিট, পুলিশ এবং মিত্র মিলিশিয়া বাহিনীকে বিরোধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখলের নির্দেশ দেন। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি মিত্র মিলিশিয়াদের সম্পৃক্ততা কমান্ডের দায় নির্ধারণকে জটিল করে তুলেছে।
‘ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া’
ল্যাঙ্কিয়েন থেকে পালিয়ে আসা পাঁচজন ব্যক্তি আল জাজিরাকে জানান, তারা ৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তারা বলেন, পাশের একটি গ্রামে লড়াইয়ের পর সরকারপন্থি বাহিনী শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছায়। সকালের শেষের দিকে শহরে মর্টার শেল আঘাত হানে এবং এরপর সাঁজোয়া যানে করে পদাতিক বাহিনী প্রবেশ করে।
৩২ বছর বয়সি গাই কেট জানান, বিস্ফোরণ শুরু হওয়ার সময় তিনি লাকড়ি কাটছিলেন। তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের খুঁজতে দ্রুত শহরে ফিরে আসেন।
জাতীয় সেনাবাহিনীর (এসএসডিএফ) দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘প্রথম যে জিনিসটি আমি দেখেছি তা হলো ধোঁয়া। এসএসডিএফ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছিল।’
ঘরে পৌঁছে তিনি তার স্ত্রীকে বুকে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় মৃত দেখতে পান। আশপাশে আরো লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তিনি বলেন, ‘সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’
পুওচ ডুওল নামে আরেক বাসিন্দা জানান, তিনি রাতে তার দাদিকে খুঁজতে ফিরে এসেছিলেন, যিনি পালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী ছিলেন না। তিনি পোড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের কাছে আরো বেশ কিছু লাশের সঙ্গে তার দাদির লাশ খুঁজে পান।
সিআইআর-এর স্যাটেলাইট চিত্র ৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ল্যাঙ্কিয়েনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ইঙ্গিত দেয়। ৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছিল যে শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এমএসএফ জানিয়েছে, হামলার পর দিনগুলোতে সরকারি বাহিনী ল্যাঙ্কিয়েনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবে ধ্বংসযজ্ঞের দায় তারা কারো ওপর চাপায়নি।
তারা উল্লেখ করেছে, এই সংঘাতের মধ্যে কেবল সরকারেরই বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
সরকার নিযুক্ত কর্মকর্তারা আল জাজিরাকে বলেছেন, বিরোধী যোদ্ধারা চলে যাওয়ার সময় শহরটি লুটপাট করেছে। তবে বিরোধী প্রতিনিধিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ওই সময় তাদের বাহিনী সেখানে উপস্থিত ছিল না। কোনো পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ধ্বংসযজ্ঞের ধরন
বাসিন্দারা নীলনদ থেকে ইথিওপিয়া সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত শহর ও গ্রামগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞের একই ধরনের চিত্র বর্ণনা করেছেন। বাসিন্দাদের মতে, প্রায়শই বিরোধী বাহিনী চলে যাওয়ার পর সামরিক পোশাক পরিহিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা সাঁজোয়া যানে করে এসে হাজির হতো। বাড়িঘর ও বাজার পুড়িয়ে দেওয়া হতো এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মানবিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লুট করা হতো। বেসামরিক নাগরিকেরা জলাভূমি এবং বনে আশ্রয় নেন, আর যারা পালাতে পারেননি তাদের হত্যা করা হয় বা তারা নিখোঁজ হন।
সিআইআর পাথাই থেকে পাওয়া সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করেছে, যেখানে যোদ্ধাদের জ্বলন্ত স্থাপনার মধ্য দিয়ে শহরের পশ্চিম প্রবেশদ্বারের দিকে যেতে দেখা যায়। তবে ভিডিওর ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ওয়ালগাক শহরের একজন সাহায্যকর্মী জ্যানি ৫ ফেব্রুয়ারির একটি হামলার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা সব জায়গায় ধোঁয়া দেখেছি। তারা গুলি ছুড়ছিল এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছিল।’
স্যাটেলাইট চিত্রে ৩ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ওয়ালগাকে ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষতি দেখা যায়, যা শহরটির নিয়ন্ত্রণ হাতবদলের ঠিক পরপরই ঘটেছিল।
কমান্ডের বক্তব্য ও শৃঙ্খলা
সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কমান্ডারদের বক্তব্য বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ডেপুটি সেনাপ্রধান এবং আগ্রোলেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান জনসন ওলোনি সেনাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তারা অভিযানের সময় কোনো জীবন বা সম্পত্তি রেহাই না দেয়। পরবর্তীতে সরকার জানায়, এই বক্তব্য তাদের সরকারি নীতির প্রতিফলন নয় এবং ওলোনি এর জন্য ক্ষমা চান।
অন্য একটি ভিডিওতে, ওয়াল নিয়াক নামে এক কমান্ডারকে বিরোধী সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আপনি নারী হোন বা মেয়ে, আমরা আপনাদের সবাইকে হত্যা করব, আমরা এখানে রিয়েক মাচারের কোনো সমর্থক চাই না।’
মানবিক বিপর্যয়
সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, এই ধ্বংসযজ্ঞের পরিণতি মারাত্মক এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জংলেইয়ে এ বছর অন্তত ২৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা লুটপাট করা হয়েছে, যার ৭০ শতাংশই এখন আর সচল নেই।
জাতিসংঘ সমর্থিত বিশ্লেষণ সংস্থা ‘ইন্টিগ্রেটেড ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি) বলছে, বেশ কয়েকটি কাউন্টিতে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি রয়েছে এবং ইতোমধ্যে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নিকোলাস কেরান্ডি বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব ‘বছরের বাকি সময় এবং সম্ভাব্যভাবে তার পরেও স্থায়ী হতে পারে’।
অন্যরা বলছেন, জংলেইয়ের এই নির্যাতন দক্ষিণ সুদানের ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
জংলেইয়ের মানবাধিকার কর্মী তের মানিয়াং গাতওয়েচ আল জাজিরাকে বলেন, ‘উপজাতিরা একে অপরকে বিশ্বাস করে না, নাগরিকেরা সরকারকে বিশ্বাস করে না এবং সরকার তার নাগরিকদের বিশ্বাস করে না। কোনো অলৌকিক কিছু না ঘটলে দক্ষিণ সুদান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।’
সূত্র: আলজাজিরা