Image description

বিশ্বায়নের যুদ্ধে অপরাধও যেন সীমানাহীন হয়ে উঠছে! এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া, অর্থ পাচার, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, চোরাচালান, দূরে থেকে সন্ত্রাসবাদ—এমন অপকর্ম বাড়ছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ও সীমান্তপাড়ের অপরাধীদের খুঁজে বের করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর একটি হলো ইন্টারপোল। অনেকেই মনে করেন—এ বিশ্বসংস্থার নিজস্ব পুলিশ বাহিনী আছে, যার সদস্যরা বিশ্বের যে কোনো দেশে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। ইন্টারপোল নিজে কাউকে গ্রেপ্তার করে না, কোনো দেশের অভ্যন্তরে অভিযানও পরিচালনা করে না। বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অপরাধী শনাক্তকরণের জন্য একটি সমন্বয় সংস্থা হিসেবে কাজ করে। সংস্থাটি বিশ্বের বড় বড় অপরাধী, চোরাচালানকারী ও অর্থ পাচারকারীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইন্টারপোল কী: এর পূর্ণরূপ হলো ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন। এটি কোনো দেশের ওপর কর্তৃত্বকারী সংস্থা নয়। ইন্টারপোল একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা। এর সদর দপ্তর ফ্রান্সের লিঁও শহরে। এর সদস্য দেশ ১৯৬টি। এর সদস্য দেশগুলোর পুলিশ ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ, অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে।

ইন্টারপোলের জন্ম ও উদ্দেশ্য: ইন্টারপোলের সূচনা হয় ১৯২৩ সালে। প্রথমদিকে এর নাম ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ কমিশন (আইসিপিসি)। ১৯৫৬ সালে সংস্থাটি ইন্টারপোল নাম গ্রহণ করে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। কোনো অপরাধী যখন একটি দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তখন তাকে শনাক্ত, অনুসরণ এবং আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারপোলের লক্ষ্য বিশ্বকে আরও নিরাপদ করতে সদস্য দেশগুলোর পুলিশের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করা। মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুলিশ সহযোগিতা নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত। মানব পাচার, শিশু নির্যাতন, মাদক ব্যবসা, সাইবার অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, অর্থ পাচার, জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক সহযোগিতা প্রদানই এর মূল কাজ।

ইন্টারপোল কীভাবে কাজ করে: ইন্টারপোলের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো তথ্য। সংস্থাটির নিজস্ব আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ রয়েছে, যেখানে লাখ লাখ অপরাধী, পলাতক আসামি, চুরি হওয়া পাসপোর্ট, যানবাহন, অস্ত্র এবং অপরাধ-সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য সংরক্ষিত থাকে। প্রত্যেক সদস্য দেশের একটি ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থাকে, যা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ইন্টারপোলের যোগাযোগ রক্ষা করে। কোনো দেশ যদি কোনো পলাতক অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পায়, তাহলে সেই তথ্য দ্রুত ইন্টারপোল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে যায়।

রেড নোটিশ কী: ইন্টারপোলের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবস্থা হলো রেড নোটিশ।

রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এটি মূলত সদস্য দেশগুলোর কাছে একটি সতর্কতামূলক বার্তা, যেখানে বলা হয় যে, একজন ব্যক্তি একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগে ওয়ান্টেড এবং তাকে খুঁজে বের করে অস্থায়ীভাবে আটক করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। রেড নোটিশ জারির আগে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত বা বিচারিক কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকতে হয়।

ইন্টারপোল যেভাবে গ্রেপ্তার করায়: ইন্টারপোলের নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। তাদের কোনো কর্মকর্তা কোনো দেশে গিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেন না।

গ্রেপ্তার করে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা। ইন্টারপোল কেবল তথ্য সরবরাহ, অবস্থান শনাক্তকরণ, আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি এবং দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের কাজ করে। মূলত ইন্টারপোলের তথ্য বা নোটিশ ব্যবহার করে স্থানীয় পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে।

গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়: একজন আন্তর্জাতিক পলাতককে ধরার ক্ষেত্রে সাধারণত নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়— কোনো দেশে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সে দেশের আদালতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশ ইন্টাপোলের কাছে চিঠি দেয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ পাঠানোর জন্য। সংস্থাটি আবেদন যাচাই করে অনুমোদন পেলে সদস্য দেশগুলোকে নোটিশ পাঠায়। এরপর অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হলে স্থানীয় পুলিশ তাকে আটক করে। পরে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অভিযুক্তকে অপরাধ সংঘটিত দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু কুখ্যাত অপরাধী বছরের পর বছর পলাতক থাকার পরও শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে।

ইন্টারপোলের জালে আলোচিত রাঘববোয়াল চার্লস শোভরাজ: এশিয়ার অপরাধজগতের খোঁজখবর রাখলে চার্লস শোভরাজের নামটা আপনার অপরিচিত হওয়ার কথা নয়। চার্লস শোভরাজকে বলা হতো ‘দ্য সার্পেন্ট’, কারণ, সাপের মতোই তিনি বারবার পুলিশের হাত ফসকে বের হয়ে যেতেন। এ ছাড়া ‘বিকিনি কিলার’ নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। কারণ, ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে ভ্রমণে আসা তরুণীদের মাদক খাইয়ে, লুট করে হত্যা করতেন তিনি। সত্তর-আশির দশকে থাইল্যান্ড, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে তার নামে অন্তত ২০টির বেশি হত্যার অভিযোগ উঠেছিল। এই সিরিয়াল কিলারকে গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোল সহায়তা করেছিল।

রাতকো ম্লাডিচ: তিনি ছিলেন বসনিয়া যুদ্ধের সময়কার অন্যতম আলোচিত সামরিক নেতা। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল। বহু বছর আত্মগোপনে থাকার পর আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও সহযোগিতার মাধ্যমে ২০১১ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

এল চাপো গুজমান: তিনি হলেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মাদক সম্রাটদের একজন। এল চাপো মেক্সিকোর সিনালোয়া কার্টেলের প্রধান ছিলেন এবং একাধিকবার কারাগার থেকে পালিয়ে যান।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিনিময় এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

ফেলিসিয়েন কাবুগা: তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি। তিনি প্রায় ২৬ বছর ধরে পলাতক ছিলেন। ইন্টারপোলের সহায়তায় ২০২০ সালে তাকে প্যারিস থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জেমস ইবোরি: নাইজেরিয়ার সাবেক এই গভর্নরের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক তদন্ত এবং একাধিক দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হয়।

মুনাওয়ার খান: ভারতের ব্যাংক জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত মুনাওয়ার খানকে কুয়েত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।

ইন্টারপোলের বৃহৎ আন্তর্জাতিক অভিযান: ২০২৫ সালে ইন্টারপোলের সমন্বয়ে ১৭টি দেশের অংশগ্রহণে পরিচালিত এক বৃহৎ অভিযানে ৮৫ জন আন্তর্জাতিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা সবাই বিভিন্ন দেশের রেড নোটিশভুক্ত অপরাধী ছিল।