Image description

ভারতের সামরিক বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্দামান সাগরে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপে শত কোটি ডলারের একটি বিমান ও নৌঘাঁটি নির্মাণ শুরু করেছে দেশটির সরকার।

ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ চীনের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ ‘মালাক্কা প্রণালি’র প্রবেশদ্বারে/মুখে অবস্থিত। চীনের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৭০ শতাংশই এই জলপথে পরিবহন করা হয়। দেশটি তাই এই পথকে ‘মালাক্কা লাইফলাইন’ বলে অভিহিত করে।

এই প্রকল্প নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্সে লিখেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেট নিকোবর প্রকল্প এই অঞ্চলকে ভারত মহাসাগরের নৌ-বিমান যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র করবে।’

এই প্রকল্প সফল হলে চীনের সঙ্গে কোনো গুরুতর সংঘাত বাধলে ভারত সুবিধা পাবে। কেবল নিজেরা নয়, ভারতের মিত্র দেশগুলোও ওই জলসীমায় এর সুফল পাবে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আকাশ ও নৌপথে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এর প্রাথমিক পর্যায় প্রস্তুত হয়ে যাবে।

গ্রেট নিকোবর ভারতের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ। নয়া দিল্লি থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এর অবস্থান।

গত ২২ মে হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ভারত মালাক্কা প্রণালির কাছাকাছি যেকোনো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। প্রকল্প সফল হলে ভারত চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা ‘নিয়ন্ত্রণ’ বা ব্যাহত করতে পারবে এবং ‘মালাক্কা সংকট’ আরও ঘনীভূত হবে।

চায়না গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টস এক বিশ্লেষণে দাবি করছে, ভারতের নিকোবর উদ্যোগ চীনের ‘মালাক্কা লাইফলাইনের’ জন্য প্রবল হুমকি।

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ভারত গ্রেট নিকোবরকে চীনের কাছাকাছি একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক ফাঁড়িতে পরিণত করতে চায়। এর মাধ্যমে ভারত মালাক্কা প্রণালি পর্যবেক্ষণের বৃহত্তর ক্ষমতা পাবে এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করবে।

কৌশলগত সামরিক  নৌবন্দর নির্মাণ

প্রকল্পের অংশ হিসেবে গ্রেট নিকোবর দ্বীপের পূর্ব উপকূলীয় ‘ক্যাম্পবেল বে’ এলাকায় গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। ওই এলাকায় ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ান নেভাল এয়ার স্টেশন বাজ রয়েছে। সেখানে উন্নত রাডার স্থাপন করা হলে মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশমুখের ওপর ভারতের নজরদারি ক্ষমতা বাড়বে।

দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলের গ্যালাথিয়া উপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দরও নির্মাণ করছে ভারত। এই উপসাগর আন্দামান সাগরের সঙ্গে যুক্ত। চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল আমদানি করে তার আনুমানিক ৭০ শতাংশ এই পথ দিয়েই মালাক্কা প্রণালিতে প্রবেশ করে। সেখান থেকে তা চীনের পূর্ব উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র  ব্লু ইকোনমি

গ্যালাথিয়া উপসাগরের আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালকে ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কুমার যোশি এই বিষয়ে বলেন, এটি সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কনটেইনার পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর মতোই এই বন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট এবং কার্গো রুট পরিবর্তনে ব্যবহার করা হবে। বড় জাহাজগুলো থেকে ছোট জাহাজে পণ্য ওঠানামা করা যাবে। ছোট জাহাজগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে কাছাকাছি বন্দরগুলোতে যাতায়াত করবে।

ভারতের নিজস্ব জাহাজগুলোকে পণ্য ওঠানামার সময় ওই বন্দরে কোনো ফি এবং কর দিতে হবে না। ফলে তাদের নিজেদের ট্রান্সশিপমেন্ট খরচ অনেকটাই কমে আসবে।

ধাপে ধাপে এই বন্দরের নির্মাণকাজ চলছে। ২০২৮ সালে এর প্রাথমিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আগামী ২০ বছর ধরে এর সম্প্রসারণকাজ চলবে।

পরিবেশ  আদিবাসীদের ওপর প্রভাবের শঙ্কা

নতুন শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে চীনকে টেক্কা দিয়ে এই দ্বীপকে ‘ভারতের হংকং’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় নয়াদিল্লি। এই প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে প্রায় ৫ লাখ মানুষ এই দ্বীপে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় আদিবাসী ‘শোমপেন’দের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩০০ জনের এই প্রাচীন ও বিচ্ছিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী সুন্দরবনের রেইন ফরেস্টে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই হাজার বছর ধরে বাস করছে। ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থা ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’ ভারতকে দেওয়া এক পিটিশনে সতর্ক করেছে, হংকং বানানোর এই প্রকল্প শোমপেনদের পুরোপুরি বিলুপ্ত বা গণহত্যার মুখোমুখি করতে পারে। এই আবেদনে বিশ্বের ৩৯ জন প্রখ্যাত জেনোসাইড ও হলোকাস্ট বিশেষজ্ঞ স্বাক্ষর করেছেন।

পরিবেশবাদীরাও এই প্রকল্পের কারণে বিষাক্ত রাসায়নিক দূষণ, বন্যপ্রাণীর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি এবং ভূমিকম্পের ফলে সুনামির আশঙ্কার কথা জানিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। তবে মোদির দাবি, এই প্রকল্প পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনীতির মেলবন্ধনের অনন্য উদাহরণ। ভারতের পরিবেশ আদালত ‘ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল’ ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের পক্ষে রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, চীনের বৈশ্বিক ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা মুক্তামালার কৌশলের বিপরীতে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির অংশ হিসেবে এই ঘাঁটি স্থাপন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত