Image description

মাত্র ৩৪ হাজার মানুষের দেশ। আয়তন ঢাকার অনেক উপজেলার চেয়েও ছোট। বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এলেই যাদের নাম প্রায়ই উঠে আসে বড় ব্যবধানে হারের তালিকায়। সেই দেশটিকেই গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
ফলাফলটি বাংলাদেশের জন্য আনন্দের। কিন্তু ম্যাচের স্কোরলাইনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য গল্প। কারণ প্রতিপক্ষ সান মারিনো শুধু একটি ফুটবল দল নয়, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো টিকে থাকা প্রজাতন্ত্রগুলোর একটি। এমন এক দেশ, যার ইতিহাস শুরু হয়েছিল প্রায় ১৭০০ বছর আগে, যখন পৃথিবীর বহু আধুনিক রাষ্ট্রের অস্তিত্বই ছিল না।

সান মারিনোর পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য

ইতালির বুকের মধ্যে ছোট্ট একটি পাহাড়ি দেশ সান মারিনো। গাড়িতে করে যেতে যেতে হঠাৎই একটি সাইনবোর্ড জানিয়ে দেয়, আপনি আর ইতালিতে নেই। কোনো সীমান্তচৌকি নেই, নেই কড়াকড়ি। কিন্তু আপনি ঢুকে পড়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে।
মাত্র ৬১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিকে অনেকেই প্রথম দেখায় ইতালির কোনো শহর বলে ভুল করেন। ভাষা ইতালীয়, খাবার ইতালীয়দের মতো, সংস্কৃতিও কাছাকাছি। কিন্তু সান মারিনোর মানুষ নিজেদের পরিচয় নিয়ে বেশ গর্বিত। তারা ইতালীয় নন, তারা সাম্মারিনেসি।
দেশটির জন্ম নিয়ে একটি জনপ্রিয় কাহিনি আছে। ৩০১ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার রাব দ্বীপ থেকে সেন্ট মারিনাস নামে এক খ্রিস্টান পাথরশিল্পী রোমান সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ানের নির্যাতন এড়িয়ে এসে আশ্রয় নেন মাউন্ট তিতানো নামের একটি পাহাড়ে। সেখানে গড়ে ওঠে একটি ছোট সম্প্রদায়। সেই সম্প্রদায়ই ধীরে ধীরে পরিণত হয় আজকের সান মারিনোতে।
বিশ্বের বহু রাজ্য, সাম্রাজ্য ও সামন্তশাসন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু পাহাড়চূড়ার এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি টিকে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
সান মারিনোর রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বেশ অদ্ভুত। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে একজন রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন। এখানে আছেন দুজন। তাঁদের বলা হয় ‘ক্যাপ্টেন রেজেন্ট’। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা আবার দায়িত্বে থাকেন মাত্র ছয় মাস। তারপর নতুন দুজন আসেন। ১২৪৩ সাল থেকে চলে আসছে এই ব্যবস্থা।
দেশটির রাজধানীও সান মারিনো। পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা মধ্যযুগীয় শহরটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। এখানে গেলে চোখে পড়ে তিনটি বিখ্যাত টাওয়ার—গুয়াইতা, চেস্তা ও মোনতালে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গগুলো শত শত বছর ধরে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে আছে।

শহরের রাস্তায় পর্যটকসান মারিনোর জাতীয় পতাকাতেও আছে সেই তিন টাওয়ারের ছবি। নিচে লেখা একটি শব্দ, ‘লিবারতাস’। অর্থাৎ স্বাধীনতা।
কিন্তু স্বাধীনতার এই গর্বিত ইতিহাসের পাশাপাশি আরেকটি পরিচয় আছে দেশটির। সেটি হলো ফুটবল।
ফুটবল বিশ্বে সান মারিনো প্রায়ই এক করুণ চরিত্র। ইউরোপের বড় দলগুলোর বিপক্ষে তাদের পরাজয় নতুন কিছু নয়। ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস কিংবা স্পেনের মতো দলগুলোর কাছে তারা একাধিকবার বড় ব্যবধানে হেরেছে।
এর পেছনে কারণও স্পষ্ট। পুরো দেশের জনসংখ্যাই মাত্র ৩৪ হাজারের মতো। বাংলাদেশের একটি ইউনিয়নের জনসংখ্যাও অনেক সময় এর চেয়ে বেশি। এত অল্প মানুষের দেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার বের করে আনা সহজ নয়।
সান মারিনো জাতীয় দল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১৯৯০ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জয় ছিল তাদের জন্য প্রায় অধরা এক স্বপ্ন।
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি অবশ্য সান মারিনোর দখলেই আছে। ১৯৯৩ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ৮.৩ সেকেন্ডে গোল করেছিলেন দাভিদে গুয়ালতিয়েরি। বহু বছর ধরে এটি ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলের দ্রুততম গোলের রেকর্ড।
সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলে হেরেছিল সান মারিনো।
তাদের প্রথম এবং দীর্ঘদিনের একমাত্র প্রতিযোগিতামূলক জয় আসে ২০০৪ সালে, লিচেনস্টাইনের বিপক্ষে। সেই জয়ের পর আবার বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে নতুন সাফল্যের জন্য।

সান মারিনোর ফুটবল স্টেডিয়ামতবু দেশটির মানুষ ফুটবল ভালোবাসা ছাড়েনি। পাহাড়ি গলি, ছোট্ট মাঠ আর স্থানীয় ক্লাবগুলোতে ফুটবল এখনও জীবনের অংশ।
বিশ্বকাপে কখনো খেলা হয়নি তাদের। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও নয়। বাস্তবে সান মারিনোর লক্ষ্য সাধারণত বিশ্বকাপ জেতা নয়, বরং একটি গোল করা, একটি ড্র পাওয়া কিংবা একটি জয় তুলে নেওয়া।
এই কারণেই বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের সাম্প্রতিক পরাজয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। এটি দুই ভিন্ন বাস্তবতার দেশের গল্পও।
একদিকে প্রায় ১৮ কোটির বাংলাদেশ, যেখানে ফুটবল নিয়ে আবেগের শেষ নেই। অন্যদিকে ৩৪ হাজার মানুষের সান মারিনো, যেখানে জাতীয় দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ের নামই পুরো দেশ চেনে।
তবে স্কোরবোর্ডের ফলাফল যাই হোক, সান মারিনোকে শুধুমাত্র দুর্বল একটি ফুটবল দল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এই দেশটি প্রমাণ করে, একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আয়তন বা জনসংখ্যায় নয়, তার ইতিহাস ও পরিচয়েও লুকিয়ে থাকে।
মাউন্ট তিতানোর চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি টাওয়ার আজও যেন সেই কথাই বলে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা পাহারা দিচ্ছে একটি ছোট্ট দেশকে। এমন একটি দেশ, যে বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি, বড় কোনো ট্রফিও জেতেনি, কিন্তু স্বাধীনতার ইতিহাসে নিজের নাম লিখে রেখেছে সবার ওপরে।
আর তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জয়ের খবর পড়তে পড়তে যদি কখনো সান মারিনোর নাম চোখে পড়ে, মনে রাখা ভালো, এটি সেই দেশ, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান দুজন, আয়তন একটি উপজেলার সমান, আর ইতিহাস প্রায় সতেরো শতাব্দী দীর্ঘ।
তথ্যসূত্র: ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার, ব্রিটানিকা, ভিজিট সান মারিনো, ফিফা, উয়েফা ও আরএসএসএসএফ