Image description

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই এতদিন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। কংগ্রেস ছেড়ে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন থেকে শুরু করে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা, টানা ১৫ বছর রাজ্য শাসন—প্রতিটি অধ্যায়েই ছিল তার প্রতিবাদী নেতৃত্বের ছাপ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর এক মাসের মধ্যেই এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল, যা দলের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বুধবারের ঘটনার ঘনঘটা কোন নাটকের থেকে কম ছিল না। যা অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের কাছেই ছিল অভূতপূর্ব। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে ৫৮ জন বিধায়ক সমর্থন জানিয়ে তাকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে স্পিকারের স্বীকৃতিও মেলে। বিদ্রোহী শিবির জানায়, আরও দুজন বিধায়ক তাদের সঙ্গে রয়েছেন এবং সংখ্যা ৬০-এ পৌঁছতে পারে।

ফলে একদিনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত পরপর অনেকগুলো বড় ধাক্কা খেয়েছেন। বিধানসভায় পরিষদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ হারানো, পরিস্থিতি সামাল দিতে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সব শাখা, সহযোগী ও উপসংগঠনের কমিটি ভেঙে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত অন্যতম। এছাড়াও কলকাতার মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিদ্রোহীরা এখনো মমতাকে নেতা হিসেবে মানার কথা বললেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে তারা। ঋতব্রত শিবিরের বক্তব্য, তাদের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু অভিষেক এবং তার ঘনিষ্ঠদের দল পরিচালনার পদ্ধতি।

আসলে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর থেকেই দলের ভেতরে অভিষেকবিরোধী সুর ক্রমশ জোরালো হয়েছে। প্রবীণ নেতা অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘অভিষেক অনভিজ্ঞ। তার হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া ভুল ছিল।’

তার অভিযোগ, কর্পোরেট ধাঁচে দল চালানোর চেষ্টা এবং আইপ্যাকের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৃণমূলকে ডুবিয়েছে।

একই অভিযোগ তুলেছেন কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী, খগেশ্বর রায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, বিবেক গুপ্ত, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো একাধিক নেতাকর্মীরা। বহু নেতা মনে করছেন, তৃণমূল ধীরে ধীরে কর্মীভিত্তিক রাজনৈতিক দল থেকে ‘কর্পোরেট মডেলের সংগঠন’ এ পরিণত হয়েছিল।

আইপ্যাকের কর্মীরা প্রার্থী নির্বাচন থেকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনেক পুরনো নেতার দাবি, তাদের মতামতের আর কোনো মূল্যই ছিল না। এর মধ্যেই গতকাল নতুন মাত্রা যোগ করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলে থাকলে দল ভরাডুবির মুখে পড়ত না। সংগঠন আরও সুসংহত থাকত।’

ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, মমতার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কি এখনও অটুট, নাকি অভিষেককে সামনে এনে দল পরিচালনার যে নতুন মডেল তৈরি হয়েছিল, সেটিই আজ বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে?

কারণ বিদ্রোহীদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তাদের লড়াই মমতার বিরুদ্ধে নয়, অভিষেকের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের ভাঙন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সময় বলবে।

কিন্তু বুধবারের ঘটনাগুলো বাংলার রাজনীতিতে একটি বার্তা স্পষ্ট করেছে। সেটি হলো  ক্ষমতা হারানোর ধাক্কার পর এবার নিজের দলের ভেতরেও সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই সংকটের কেন্দ্রে ঘুরেফিরে উঠে আসছে একটাই নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।