সুদানে চলমান সংঘাতের মধ্যে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ব্যাপক যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা দেশটির পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নারী অধিকারকর্মী হালা আলকারিব। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে হাজারো নারী ও শিশু পরিকল্পিত যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হলে সুদানের স্থায়ী শান্তি ও পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।
হালা আলকারিব হর্ণ অব আফ্রিকা অঞ্চলে নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার (সিহা) পরিচালক। তিনি জানান, সুদানের বিভিন্ন সংঘাতে দীর্ঘদিন ধরেই যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভূমি দখল, জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা, সম্পদ লুট এবং সম্প্রদায়কে ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য নারীদের টার্গেট করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দারফুর ও দক্ষিণ করদোফান অঞ্চলে গত ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নারীরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন। তবে ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই সহিংসতা নতুন মাত্রা লাভ করে। তিনি অভিযোগ করেন, আরএসএফ এবং তাদের মিত্ররা রাজধানী খার্তুম, জাজিরা, উত্তর নীলনদ, শ্বেতনীল ও উত্তর করদোফান অঞ্চলে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন নির্যাতন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে।
আলকারিব জানান, তিনি এমন বহু ঘটনার সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছেন যেখানে মায়েরা নিজেদের সন্তানদের রক্ষা করতে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক শিক্ষিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই নারী নিজের ১৪ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এছাড়া বহু পরিবারে পুরুষ সদস্যদের হত্যা করার পর নারী ও শিশুদের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেক ভুক্তভোগী শুধু নির্যাতনের শিকারই হননি, বরং পরে নিজেদের সমাজের কাছ থেকেও অপমান, দোষারোপ এবং সামাজিক বর্জনের মুখোমুখি হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারীরা মানসিক আঘাত ও সামাজিক চাপে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন।
নারী অধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শত শত নারী ও শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের উভয় পক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে নারী অধিকার সংগঠনগুলোর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত সহায়তা বাহিনীর সহযোগী সন্দেহে আট শতাধিক নারীকে আটক করা হয়েছিল। তাদের অনেকেই কারাগারে যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হালা আলকারিব বলেন, সুদানে যৌন সহিংসতার মূল কারণ রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক ও সহিংস রাজনৈতিক কাঠামো। অবাধ অস্ত্র প্রবাহ, নিরাপত্তা খাত সংস্কারের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও যৌন সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি। পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সহায়তাও নেই।
তার মতে, বেঁচে থাকা নারীদের শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসন, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক মিলেমিশে থাকা ছাড়া সুদানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইকে সুদানে শান্তি, ন্যায়বিচার ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের বৃহত্তর সংগ্রামের মূলে স্থান দিতে হবে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান