রাজনীতি সাধারণত প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হলেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের ধারণা বদলে দেয়। নাইজেরিয়ার রাজনীতিতে সম্প্রতি এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিয়েছেন মাহমুদ সাদিস বুবা। তাকে ডাকা হতো ‘আবিন আল আজাবিন জাজাউ’
বা ‘জারিয়ার বিস্ময়’ নামে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নাইজেরিয়ার পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে তার আবির্ভাব দেশটিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সবাই ভেবেছিল সে দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এই কিশোরের রাজনৈতিক যাত্রা বড় অনুপ্রেরণা নিয়ে আসলেও সেই অনুপ্রেরণার গল্পটি খুব দ্রুতই দেশব্যাপী বড় ধরনের কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়।
ঘটনার সূত্রপাত মাসখানেক আগে। নাইজেরিয়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল অল প্রগ্রেসিভস কংগ্রেস বা এপিসির পক্ষ থেকে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের একটি আসনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছিল। এই বাছাই প্রক্রিয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাহমুদ সাদিস বুবার নাম পুরো নাইজেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ছোটখাটো গড়ন, শিশুর মতো চেহারা, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তিনি বলছিলেন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা। জারিয়ার সাবন গারি এলাকার বাসিন্দা বুবা নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি একজন সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেটধারী এবং অতীতে গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করেছেন। তার শারীরিক গঠন এবং ছোটখাটো চেহারার কারণ হিসেবে তিনি ডোয়ার্ফিজম বা বামনত্বকে দায়ী করেছিলেন। ওই ভিডিওতে তিনি নিজের বয়স ৩০ বছর বলে দাবি করেন।
দলের নেতাদের সামনে বুবা আরও বলেছিলেন, এটি কেবল আমার বিষয় নয়, এটা জনগণের দাবি। জনগণ আমাকে তাদের সেবা করার জন্য ডেকেছে এবং আমি তাদের সেবা করব। তার এই সাধারণ কথাটি নাইজেরিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে এটি অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ তাকে নাইজেরিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অনেকেই তাকে সাহসী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু এই উচ্ছ্বাস খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তার বয়স নিয়ে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
বুবা দাবি করেছিলেন যে তিনি ১৯৯৫ সালের ২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেই হিসেবে তার বয়স ৩০ বছরের বেশি। কিন্তু ইন্টারনেটে ফাঁস হওয়া তার কিছু নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে এই দাবির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ফাঁস হওয়া তথ্যে দেখা যায়, তার জন্ম তারিখ ১৯৯৫ সালে নয়, বরং ২০১০ সালে। নাইজেরিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। যদি তিনি ২০১০ সালে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তবে তার বয়স হয় মাত্র ১৫ থেকে ১৬ বছর। নাইজেরীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী তিনি একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তার পাসপোর্ট, এনআইএন স্লিপ, জন্ম সনদ এবং স্কুলের রেকর্ডপত্র জনসম্মুখে আসে। এই সব নথিপত্র প্রমাণ করছিল যে তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন কিশোর মাত্র। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তখন আরও বৃদ্ধি পায় যখন বুবার একজন প্রাক্তন শিক্ষক সামনে এগিয়ে আসেন। সেই শিক্ষক দাবি করেন, বুবা তার ছাত্র ছিল এবং যখন সে জুনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ত তখন তিনি তার শিক্ষক ছিলেন। সেই শিক্ষকের নিশ্চিত করা তথ্য অনুযায়ী বুবার বয়স ১৬ বছর। এই তথ্যের পর পুরো নাইজেরিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
শুরুতে এপিসি দল বুবাকে সমর্থন করে জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার এটি একটি ষড়যন্ত্র। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পাহাড়সম প্রমাণ জমতে থাকায় দলীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এপিসি তাকে বয়স জালিয়াতির অভিযোগে অযোগ্য ঘোষণা করে। চাপের মুখে পড়ে বুবা একটি চিঠির মাধ্যমে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এপিসি চেয়ারম্যানের কাছে লেখা সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, দলের নেতা এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, সাবন গারি ফেডারেল কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছি। এটি সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, তবে দলের স্বার্থে এই পথে হাঁটতে হয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে নাইজেরিয়ার সাধারণ মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন জাগে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা ডোয়ার্ফিজম থাকা মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোর কীভাবে এপিসির মতো এত বড় একটি রাজনৈতিক দলের কঠোর স্ক্রিনিং বা বাছাই প্রক্রিয়া পার হয়ে গেল? তাকে এই পথ দেখাল কে? এর পেছনে কি দলের অভ্যন্তরীণ অযোগ্যতা কাজ করেছে, নাকি প্রভাবশালী কারো যোগসাজশে তাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনা নাইজেরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতার দিকেই আঙুল তুলছে।
মাহমুদ সাদিস বুবার এই সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক যাত্রা নাইজেরিয়ার ইতিহাসের এক অদ্ভুত দলিল হয়ে থাকবে। কেউ তাকে দেখছেন একজন সরল কিশোর হিসেবে, যাকে হয়তো বড় কোনো চক্র নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। আবার অনেকের মতে, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্ধ দৌড়ে নৈতিকতার সীমানা অতিক্রম করা হয়েছে। যে ‘জারিয়ার বিস্ময়’ পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, দিনশেষে তিনি হয়ে রইলেন এক শিক্ষা যা রাজনৈতিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে।