Image description

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে পুরো বিশ্বে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, যার সরাসরি শিকার হবেন কোটি কোটি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় বন্যা নিয়ে গবেষণা করা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রাল একটি মানচিত্র তৈরি করেছে। সেই মানচিত্রে দেখা গেছে, সঠিক সময়ে সরকারগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর জোয়ারের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ প্রভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে যে শহরগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে চলে যেতে পারে, নিচে সেটির একটি তালিকা দেওয়া হলো:

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

খুলনাবাংলাদেশ

বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর খুলনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২৯ ফুট (৯ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২১ সালের বিধ্বংসী বন্যায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ চরম বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, তবে এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলটি আরও বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

 

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

কলকাতাভারত

কলকাতা ও এর আশপাশের অঞ্চল উর্বর ও চাষযোগ্য জমির কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু শহরটি যেভাবে চারপাশের এলাকায় প্রসারিত হচ্ছে, সেখানেই মূল উদ্বেগের কারণ লুকিয়ে আছে। ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জমি না থাকায় তীব্র সংকটে পড়তে পারে কলকাতা।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

ভেনিসইতালি

নিকট ভবিষ্যতে ভেনিস দুটি বড় হুমকির মুখোমুখি: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর শহরটির নিজস্ব ভূমি দুই মিলিমিটার করে দেবে যাওয়া। ইতোমধ্যে মারাত্মক বন্যার শিকার হওয়া এই শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ জোয়ারের প্রকোপ আরও বাড়বে, যা শহরটিকে ডুবিয়ে দিতে পারে। সেখানে বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও পরিস্থিতি খারাপ হলে তা বজায় রাখা কঠিন হবে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

মালেমালদ্বীপ

দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ দীর্ঘ সময় ধরেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি সম্পর্কে সচেতন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ইতোমধ্যে একটি ভাসমান শহর তৈরি করা শুরু করেছে। মালের অবকাঠামো এবং চারপাশের দ্বীপগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে হুলহুমালের মতো দ্বীপগুলোতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

ব্যাংককথাইল্যান্ড

২০২০ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংকক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫ ফুট (১.৫ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত এবং এটি ভেনিসের চেয়েও অনেক দ্রুত দেবে যাচ্ছে। তাছাড়া শহরটি ঘন কাদা মাটির ওপর নির্মিত হওয়ায় এখানে বন্যার ঝুঁকি বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে থা খাম এবং সামুত প্রাকানের উপকূলীয় অঞ্চল এবং প্রধান বিমানবন্দর সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পানির নিচে চলে যেতে পারে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

হো চি মিন সিটিভিয়েতনাম

হো চি মিন সিটির পূর্ব দিকের জেলাগুলো, বিশেষ করে সমতল ‘থু থিয়েম’ এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মেকং ডেল্টা বা বদ্বীপ অঞ্চলেও শহরটি ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থল পুরোপুরি পানির নিচে না গেলেও, এটি বন্যা এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঝড়ের প্রতি আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

বসরাইরাক

বসরা হলো ইরাকের প্রধান বন্দর নগরী, যা পারস্য উপসাগরে পতিত হওয়া বিশাল নদী শাত আল-আরবের তীরে অবস্থিত। খাল, ছোট নদী এবং পাশ্ববর্তী জলাভূমির জালের কারণে বসরা এবং এর চারপাশের এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। এর ওপর শহরটি ইতোমধ্যে পানিবাহিত রোগে ভুগছে, ফলে বন্যা বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

নিউ অরলিন্সযুক্তরাষ্ট্র

শহরটিতে বাঁধ এবং বন্যা প্রতিরোধক দেয়াল রয়েছে, যা উত্তর দিকের লেক মুরেপাস এবং দক্ষিণ দিকের লেক সালভাডর ও লিটল লেকের বন্যার পানি থেকে শহরটিকে রক্ষা করে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে শহরটি আগেই তলিয়ে যেত। তবে এই ব্যবস্থা থাকার পরেও যেকোনও বড় ক্ষতি বিপর্যয়কর হতে পারে। যেমন ২০০৫ সালের ক্যাটরিনা হারিকেনের সময় ৫০টিরও বেশি বাঁধ ও দেয়াল ভেঙে গিয়ে শহরের ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

সাভানাযুক্তরাষ্ট্র

সাভানা শহরটি হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। তবে চরম আবহাওয়া ছাড়াও এই ঐতিহাসিক শহরটির জমি সমুদ্রের গ্রাসে চলে যেতে পারে। উত্তরের সাভানা নদী এবং দক্ষিণের ওগিচি নদী; উভয়ই শহরটিকে প্লাবিত করতে পারে, যার অর্থ হারিকেন এবং বন্যা দেখা দিলে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হবে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

আমস্টারডামনেদারল্যান্ডস

নেদারল্যান্ডসকে নিচু দেশ বলার পেছনে কারণ রয়েছে। আমস্টারডাম, রটারডাম এবং দ্য হেগ শহরগুলো উত্তর সাগরের খুব কাছাকাছি এবং নিচু এলাকায় অবস্থিত। বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিচিত এই দেশের বাঁধ, ব্যারিয়ার এবং ফ্লাডগেট ব্যবস্থা আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

নাগোয়াজাপান

জাপানের কিছু উপকূলীয় শহরের ভৌগোলিক গঠনের কারণে সেগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে মে এবং অক্টোবর মাসের টাইফুন বা ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে। অধিকাংশ শহর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুসজ্জিত হলেও শিল্প বন্দর নগরী নাগোয়া বড় সমস্যায় পড়তে পারে। নাগারা এবং কিসো নদীর পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই শহরের পশ্চিমাঞ্চল চরম বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

পোর্ট সাইদমিসর

মিসরের উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় শহর পোর্ট সাইদ কেবল জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতেই নেই, বরং এই শহরের পশ্চিম এবং নিচের বিশাল এলাকাও পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় সরকার ইতোমধ্যে বালু ও কংক্রিট দিয়ে বাঁধ তৈরি করা শুরু করেছে যাতে কৃষকেরা বন্যায় জমি ও ফসল না হারান।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

জর্জটাউনগায়ানা

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গায়ানার রাজধানী জর্জটাউন ঝড় থেকে বাঁচতে সমুদ্র দেয়ালের ওপর নির্ভর করে আসছে, যার মধ্যে ২৮০ মাইল দীর্ঘ একটি বিশাল দেয়াল রয়েছে। গায়ানার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ উপকূলে বাস করে। জর্জটাউনের মধ্যাঞ্চলকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে এই সমুদ্র দেয়ালটিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

ড্যান্ডংচীন

ড্যান্ডং পর্যটকদের কাছে খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও এটি প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাসের একটি বিশাল শহর। ইয়ালু নদীর তীরে অবস্থিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই শহরটি উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি। জোয়ারের স্তরের নিচে থাকা এই অঞ্চলটি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তলিয়ে যেতে পারে খুলনা ও কলকাতাসহ বিশ্বের ১৫ শহর

বাঞ্জারমাসিনইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার বাঞ্জারমাসিন শহরটি মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে বারিতো নদীর কাছের একটি জলাভূমি বদ্বীপে গড়ে উঠেছে। ‘হাজার নদীর শহর’ নামে পরিচিত বাঞ্জারমাসিন আদিবাসী বাঞ্জারেজ সংস্কৃতির একটি কেন্দ্র, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

তথ্যসূত্র: টাইম আউট, ক্লাইমেট সেন্ট্রাল ও লাইভ সায়েন্স