Image description

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের ঘোষপাড়ার গরু খামারি সাধন ঘোষ। নিজের গোয়াল ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, তাঁর আর কোনো পথ খোলা নেই। স্থানীয় এক মহাজনের কাছ থেকে তিনি ৪ শতাংশ সুদে ৫ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, নিজের ১০টি গরুর মধ্যে ৯টি বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু এখন তা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। এদিকে প্রতিদিন প্রতিটি গরুর পেছনে ৫০০ রুপি করে খরচ হচ্ছে।

ঘোষপাড়া থেকে প্রায় অল্প দূরেই পোলেরহাট গরুর হাট। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার গরু কেনাবেচা হয়। এ বছর কোরবানির ঈদ হবে ২৭-২৮ মে। কিন্তু হাটে গিয়ে দেখা যায় হাতে গোনা দু-ডজন গরু আছে। গরুর মালিক ও অল্প কিছু ক্রেতা গরমের মধ্যে অনাগ্রহভরে দাঁড়িয়ে আছেন।

ক্ষমতায় এসেই পশ্চিমবঙ্গে ‘অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণা দেয় বিজেপি। এই আইনে বলা আছে, ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাণীই কেবল বৈধভাবে জবাই করা যাবে। এছাড়া প্রাণীটি জবাইয়ের উপযুক্ত কিনা তা নিয়ে পৌরসভা বা পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান ও সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ সনদ থাকতে হবে।

কিন্তু প্রাণীর বয়স নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই ফিটনেস সনদ দেওয়ার কার্যকর পদ্ধতিও। তার ওপর বিজেপি সরকারের অধীনে আইন ভাঙার আশঙ্কায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একারণে পোলেরহাট গরুর হাট প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে কলকাতায়ও।

গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ২৮০ রুপি থেকে বেড়ে ৬০০ রুপিতে পৌঁছেছে।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অল্প কয়েকটি রাজ্যের একটি যেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে গরুর মাংস খাওয়া ও গরু জবাই বৈধ।

গরুর বিক্রি কমে যাওয়ায় কলকাতার রাজাবাজারের ছাগল ও ভেড়ার বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে। এটিকে এখন ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জবাইয়ের আগে পশু চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রায় কার্যকর হয় না।

ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) নেতা ও ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত পর্যায়ে পশু চিকিৎসক নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় ফিটনেস সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। তিনি বলেন, ১৩ মে জারি করা গরুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত নির্দেশনার কারণে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই সমস্যায় পড়েছে।

আসন্ন কোরবানির ঈদ প্রসঙ্গ টেনে সিদ্দিকি লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গ অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৫০–এর ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী ধর্মীয় কারণে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার ছাড় দিতে পারে।

তবে বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য রাহুল সিনহা ‘বৃহত্তর স্বার্থের’ কথা বলেছেন। তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে কিছু মানুষকে কিছু অসুবিধা সহ্য করতেই হবে। বাবা-মা বৃদ্ধ হলে তাঁদের বিক্রি করা উচিত নয়। তাই গভীর চিন্তাভাবনার পর বিদ্যমান আইনটি যেভাবে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেভাবেই কার্যকর করা হয়েছে।

হতাশ সাধন ঘোষ এসবের অর্থ বোঝার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আমার পালন করা জাতের গরু সাত মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ভালো দুধ দেয়। এরপর তারা আর বাচ্চাও দেয় না। তাই ব্যাংক থেকে ১ লাখ এবং মহাজনের কাছ থেকে ৫ লাখ রুপি ঋণ নিয়ে কেনা ১০টি গরুর মধ্যে ৯টি বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন শুনছি, ১৪ বছরের বেশি বয়সী গরুই শুধু জবাইয়ের জন্য বিক্রি করা যাবে, তাও আবার ফিটনেস সনদ লাগবে। আমি কীভাবে বুঝব আমার গরুর বয়স কত? এই সনদ কোথায় পাব? আমি কিছুই জানি না।

ঘোষপাড়ারই আরেক বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী ভাস্কর ঘোষের ২২টি গরু আছে। তিনি ১৫টি বিক্রি করার আশা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা গোশালার মালিক, দুধ সরবরাহ করি। প্রতি বছর এই সময় কম দুধ দেওয়া বা বাচ্চা না হওয়া গরুগুলো বিক্রি করি। আমার দাদুর সময় থেকে এভাবেই চলছে। কিন্তু এবার হঠাৎ করে ১৯৫০ সালের সেই আইন কার্যকর করা হলো, যার কথা আমি কখনও শুনিনি।

কোরবানির ঈদের সময়ই সাধারণত তাঁদের সবচেয়ে বেশি লাভ হয়। ভাস্করের ভাষায়, ৭০-৮০ হাজার রুপিতে কেনা প্রতিটি গরু অন্তত ১ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়। তাঁর বেশি ক্ষতি হতে পারে। কারণ তিনি ৫ শতাংশ সুদে ৭ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, গরুর খাবারের খরচও আমাকে চালাতে হচ্ছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। এই গরুগুলো নিয়ে আমরা কী করব? আর কত দিন এদের খাওয়াব?

৪৮ বছর বয়সী অপর্ণা ঘোষ বলেন, তাঁদের মতো গরুপালকদের নতুন নিয়ম মেনে চলার জন্য সরকার কিছুটা সময় দিতে পারত।

পোলেরহাট গরুর হাটে আসা ৫৪ বছর বয়সী সাদেক মোল্লা নিজের গরু ও সঙ্গে আসা নাতিকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। শ্যামনগরের বাসিন্দা সাদেক বলেন, আমি সকাল ৬টা থেকে এখানে আছি। এখন দুপুর ২টা। তিনি জানান, গত বছর এই সময়ে এত ভিড় থাকত যে মাঠে ঢোকাই কঠিন ছিল।

প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরের বসিরহাট থেকে পাঁচটি গরু নিয়ে আসা ৩০ বছর বয়সী মির আরিফিন বলেন, এ বছর ব্যবসা হবে না—এটা তাঁরা মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে কারও কাছে ফিটনেস সনদ নেই, কেউ গরুর বয়সও বলতে পারছে না। আমার গরুগুলো বিক্রি করে ৪০ হাজার রুপির আশা করেছিলাম। আজ একটাই প্রস্তাব পেয়েছি, ১৫ হাজার রুপির। বিক্রি করিনি। গত বছর প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার গরু বিক্রি হতো। আজ সকাল থেকে মাত্র এক ডজনের মতো বিক্রি হয়েছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে।

হাটের এক ক্রেতা মহিবুল ইসলাম বলেন, এ বছর জবাইয়ের অনুমতি নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে চাহিদাও কম। সরকার বলেছে, কোরবানি শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় করা যাবে। কিন্তু সেই জায়গাগুলো এখনো চিহ্নিত হয়নি। প্রকাশ্যে জবাইও করা যাবে না।

তবুও মহিবুল আশা করছেন, ভালো দামে গরু পেয়ে যাবেন। না হলে ছাগল কিনবেন। আমার অনেক প্রতিবেশী কোরবানির জন্য ছাগলের দিকে ঝুঁকছেন।

কলকাতা বিফ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ট্যাংরার সরকারি কসাইখানাও গত দুই দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে দাম আরও বেড়েছে। রাজাবাজারের এক গরুর মাংস বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাংসই নেই।

বিফ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য বলেন, কেন কসাইখানা বন্ধ, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। আমাদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। এখন প্রতিদিন মাত্র দুটি মহিষ জবাই করা হচ্ছে। তাও কলকাতা চিড়িয়াখানার প্রয়োজন মেটাতে।

অ্যাসোসিয়েশনটি নিজেদের দাবি জানাতে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করছে।

নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ শফিক কাসমি বলেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি চান স্পষ্টতা। তাঁর মতে, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অবকাঠামো প্রস্তুত করার পর আইন কার্যকর করা হলে মুসলিম ও হিন্দু গরু ব্যবসায়ীদের এই দুর্ভোগ এড়ানো যেত।

তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, গরু হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত হলেও এই বিধিনিষেধ মহিষ, বলদ, উট ও অন্যান্য বড় প্রাণীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। সবাই আইন মানবে, কিন্তু মানুষের জীবন সহজ করাও সরকারের দায়িত্ব।

অন্যথায়, কাসমির মতে, সরকারকে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পথেই যেতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আইন মেনে চলা নাগরিক। আমরা গরু কোরবানি দেব না। বরং সরকার গরুকে জাতীয় প্রাণী ঘোষণা করুক এবং জবাই ও মাংস রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করুক।

সিদ্দিকির আগে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা অধীর চৌধুরীও মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বিষয়টি নিয়ে ‘অস্বস্তি ও বিভ্রান্তির’ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের মতো এলাকায় জেলা প্রশাসন যাতে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে পারে সাহায্য করো। কোরবানির জন্য যাতে স্থান চিহ্নিত করে দেওয়া হয়।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত