ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে জ্বালানি উৎপাদনকারী আরব দেশগুলো। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত দেশগুলো পড়েছে চরম বেকায়দায়। ফলে দেশগুলোর বাণিজ্যিক আয়ে টান পড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার দেশটি ঠিক কতদিন এই অচলাবস্থা বজায় রাখবে, তা এখন অনিশ্চিত। কারণ হরমুজ প্রণালিকে কার্যত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে এবার বিকল্প পথে হাঁটতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে আক্রশের শিকার হয়েছিল দেশটি। আবুধাবির তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর, জাহাজ, বন্দর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল। এবার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে মনোনিবেশ করতে যাচ্ছে আবুধাবি।
গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন একটি পশ্চিম-পূর্ব তেল পাইপলাইন দ্রুত নির্মাণ করছে। এটি চালু হলে ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) তেল রপ্তানির সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। পাইপলাইনটির কাজ চলমান। আগামী বছর নাগাদ এটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এডিএনওসি হলো আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি সংস্থা ও বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক।
আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স ও আবুধাবি এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সভাপতিত্বে আবুধাবিতে অবস্থিত কোম্পানির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এডিএনওসি পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটির একটি বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। বৈঠক চলাকালে তিনি নিরাপদ কার্যক্রম বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে দৃঢ়তার জন্য এনডিএনওসি-এর প্রশংসা করেন।
শেখ খালেদ এনডিএনওসি-কে প্রকল্পটির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করারও নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ সংস্থাটি বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিশ্বমানের প্রকল্প বাস্তবায়নের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
অন্যান্য প্রকল্প
নির্বাহী কমিটি আল ধাফরার আল রুওয়াইস শিল্প শহরে গড়ে ওঠা তা’জিজ ফেজ-১ রাসায়নিক প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে। তারা বলেছে, এই প্রকল্প নতুন শিল্প ও দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শেখ খালেদ ‘মেক ইট ইন দ্য এমিরেটস ২০২৬’-এ ঘোষণা দেওয়া তা’জিজের দীর্ঘমেয়াদি কাঁচামাল ও পণ্য সরবরাহ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি, আলফা দুবাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ১৪ ধরনের শিল্প রাসায়নিক উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব রাসায়নিক নির্মাণ, গাড়ি শিল্প, প্যাকেজিং ও দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ তা’জিজ প্রকল্প বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন শিল্প রাসায়নিক উৎপাদন করতে পারবে। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম বড় সমন্বিত রাসায়নিক শিল্প হাবে পরিণত হবে।
শেখ খালেদ স্থানীয় ব্যবসা ও উৎপাদকদের জন্য প্রবৃদ্ধি ও মূল্য সৃষ্টির সুযোগ তৈরিতে অ্যাডনকের ইন-কান্ট্রি ভ্যালু (আইসিভি) কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এনডিএনওসি-কে তার সকল প্রকল্প ও কার্যক্রমে ‘মেড ইন দ্য এমিরেটস’ পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করলে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে দেয় ইরান। ফলে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাধাগ্রস্ত হয়। জ্বালানি রপ্তানিতে প্রণালিটির ওপর আরব আমিরাত ছাড়াও কাতার, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত নির্ভরশীল।
আরব আমিরাত ও সৌদি আরবই একমাত্র উপসাগরীয় উৎপাদক, যাদের হরমুজ প্রণালির বাইরে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইন রয়েছে। অন্যদিকে ওমানের ওমান উপসাগরে একটি দীর্ঘ উপকূল রয়েছে।