Image description

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এমনকি শুভেন্দুকে নিয়ে বলতে গিয়ে মমতা একবার বলেছিলেন, ‘আমি তাকে আমার ছোট ভাইয়ের মতো দেখি।’ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে কয়েক বছর আগে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার পর মমতাকে হারিয়ে এবার তার ভাইয়ের মতো শুভেন্দুই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।

শনিবার (৯ মে) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী। সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটায়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এল বিজেপি। বিবিসির প্রতিবেদন।

সমর্থকদের কাছে শুভেন্দু অধিকারী একজন তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তিনি রাজ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীক।

১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম শুভেন্দুর। তার বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন সংসদ সদস্য। কংগ্রেস দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি।

‘ভাইয়ের মতো’ শুভেন্দু যেভাবে মমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন  

 

 

দীর্ঘদিন তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব কমে যাওয়া, দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং সংগঠনে নিজের প্রভাব হারানোকে কেন্দ্র করে শুভেন্দুর অসন্তোষ বাড়ে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল।

এরই মধ্যে ২০১৬ সালে একটি স্টিং অপারেশন ঘিরেও বিতর্কে জড়ান তিনি। ওইসময় একটি ভিডিওতে কয়েকজন তৃণমূল নেতাকে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। শুভেন্দুও সেখানে টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পরিস্থিতি আরও তিক্ত হয়ে ওঠে ২০২০ সালে। শেষ পর্যন্ত ওই বছরই নাটকীয়ভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। এরপর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এবার তিনি নন্দীগ্রামের পাশাপাশি মমতার দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরেও তাকে পরাজিত করেন।

 

‘ভাইয়ের মতো’ শুভেন্দু যেভাবে মমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন  

 

তবে রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি বিতর্কও পিছু ছাড়েনি শুভেন্দুর। বিভিন্ন সময়ে তার সাম্প্রদায়িক ও উসকানিমূলক মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ২০২১ সালে এক বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে ‘বেগম’ আখ্যা দিয়ে ‘মিনি পাকিস্তান’ প্রসঙ্গ তোলায় নির্বাচন কমিশন তার বিরুদ্ধে নোটিশ দেয়।

গত বছর তিনি মন্তব্য করেন, ২০২৬ সালে ক্ষমতায় এলে বিজেপি মুসলিম বিধায়কদের বিধানসভা থেকে বের করে দেবে। এ বক্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।

এছাড়া তৃণমূল পরিচালিত একটি স্বাস্থ্য শিবিরের ওষুধ নিয়ে ’হিন্দু জনসংখ্যা কমানোর’ ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

এদিকে সরকার গঠনের পরও পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা থামেনি। বুধবার শুভেন্দুর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত সহকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিজেপির দাবি, এটি পরিকল্পিত হামলা। পুলিশ জানিয়েছে, অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা এই হামলা চালিয়েছে।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে এখন বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প বিনিয়োগের ঘাটতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক সংঘাতের সমস্যায় ভুগছে পশ্চিমবঙ্গ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনমুখী ও আক্রমণাত্মক রাজনীতির বাইরে এসে এখন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করাই হবে শুভেন্দু অধিকারীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।