Image description

দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত হতে পারে আরও বিপজ্জনক। বাইরের শক্তিগুলোর পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। গত বছর মে মাসে এই দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। তার প্রথম বার্ষিকীতে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ক্রমবর্ধমান মূল্যায়ন এমনটাই বলছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।

 

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব হয়তো ঝুঁকিটিকে কম করে দেখছে। পত্রিকাটি উল্লেখ করে, বিশ্ব পরিস্থিতি কতটা বিশৃঙ্খল, তা বোঝা যায় যখন দুই বৈরী পরমাণু শক্তির মধ্যে যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকী আসছে, অথচ খুব কম মার্কিন নাগরিকই তা মনে রেখেছে। তারা আরও বলে, আরেকটি সংকট ‘হবে কি হবে না- এ প্রশ্ন নয়, বরং কবে হবে সেটাই প্রশ্ন।’

সম্পাদকীয়তে মে ২০২৫ সালের সংঘাতকে নতুন ধরনের ‘নন-কনট্যাক্ট’ যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান শক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু স্থল আক্রমণ হয়নি। এতে সতর্ক করা হয়, দুই পক্ষই এখন হয়তো মনে করছে তারা সীমিত প্রচলিত যুদ্ধ করতে পারবে, যা পারমাণবিক উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না। কিন্তু এই ধারণা মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হতে পারে।

পত্রিকাটি ডনাল্ড ট্রাম্পের আমলে কূটনৈতিক পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরে। যদিও স্বীকার করা হয়েছে যে মার্কিন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে সক্রিয় ছিলেন, তবুও ট্রাম্পের বারবার দাবি- তিনি যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতা করেছেন, এ নিয়ে ভারতের অস্বস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়। বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এই টানাপড়েন ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

এর আগে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য আরেকটি উত্তেজনার উৎস হিসেবে পানির বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকার ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ পাকিস্তান পানিকে ‘জাতীয় স্বার্থের মৌলিক বিষয়’ হিসেবে দেখে। তারা সতর্ক করেছে- পানির প্রবাহ বন্ধ করার যেকোনো চেষ্টা ‘যুদ্ধের ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষি সিন্ধু অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পানির প্রশ্নটি সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করতে পারে।

 

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড কনটেম্পোরারি রিসার্চের এক প্রতিবেদনে পরিবেশগত ঝুঁকির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কিন্তু উপেক্ষিত প্রভাব পড়ে পরিবেশে। এমনকি সীমিত পারমাণবিক সংঘর্ষও বায়ুমণ্ডলে ধোঁয়া ছড়িয়ে ‘নিউক্লিয়ার কুলিং’ তৈরি করতে পারে। এর ফলে পৃথিবী দীর্ঘ সময় ঠাণ্ডা, শুষ্ক ও অন্ধকার হয়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং ‘নিউক্লিয়ার দুর্ভিক্ষ’ তৈরি হয়ে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।

ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ছে

ফরেন অ্যাফেয়ার্সে লেখা এক প্রবন্ধে মার্কিন গবেষক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেন, ভবিষ্যৎ সংঘাতে ঝুঁকির ধরন বদলাচ্ছে। তিনি লিখেছেন, ভারত ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে আগের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। তার মতে, এখন ঝুঁকি ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ নয়, বরং ভুল হিসাব বা অনিচ্ছাকৃত উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে। ভবিষ্যতের সংঘাতে ‘আরও গভীর হামলা, কম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং নতুন যুদ্ধক্ষেত্র’ দেখা যেতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের পক্ষে সংকট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ জানিয়েছে, পরিবর্তিত কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতার দাবি ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। অন্যদিকে, সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরান সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা তার কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে- যা ভারতের উদ্বেগও বাড়াচ্ছে।