ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধবিরতি চলছে যুক্তরাষ্ট্রের। তবে এর মধ্যে দেশটিতে সম্ভাব্য নতুন হামলার বিষয়ে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করছে মার্কিন সরকার।
গতকাল মঙ্গলবার ইসরাইলি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানায়।
খবরে বলা হয়, ইরানে নতুন ধাপের হামলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ দফায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এছাড়া শীর্ষস্থানীয় ইরানি কর্মকর্তাদেরও হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন ধাপের হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত বেশিরভাগ বিষয় অবশ্য গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির ঠিক আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সিএনএনকে ইসরাইলি সূত্র বলে, ‘এর মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত এক অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, যাতে মীমাংসার জন্য ইরানকে আরো চাপে ফেলা যায়।’ তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হরমুজে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের নৌযান উদ্ধারের লক্ষ্যে অভিযানের ঘোষণা দেন। এর জেরে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌযানের অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
গত সোমবার হরমুজে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে ইরানের নৌবাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর একাধিক যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলার দাবি জানানো হয়। অপরদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে এ তথ্য অস্বীকার করা হয়।
মার্কিন হামলায় হরমুজে ইরানের পাঁচ বেসামরিক নাগরিক নিহত
এদিকে গতকাল ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হামলায় ইরানের পাঁচ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে বিবৃতিতে জানানো হয়, সোমবার মার্কিন হামলায় ছয়টি বেসামরিক পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌযান ধ্বংস হয়। এতে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে ইরানের দিকে আসা দুটি ছোট পণ্যবাহী নৌযানের ওপর মার্কিন বাহিনী হামলা ও গুলি চালায়।
এর আগে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার অভিযানের সময় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে আইআরজিসির ছয়টি নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ওই অভিযানে মার্কিন বাহিনীর ‘সি হক’ এবং ‘অ্যাপাচি’ অ্যাটাক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল।
আমিরাতে হামলার পরিকল্পনা ছিল না : ইরান
এদিকে গতকাল ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজকে বের করতে মার্কিনিদের দুঃসাহসিকতার ফলে এ ঘটনা ঘটে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন বাহিনীকে বাধা দিতে গিয়েই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী।
ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত শক্তি প্রয়োগের এ আচরণ বন্ধ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ এই তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসন থেকে বিরত থাকা। এর আগে গত সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহতে পেট্রোলিয়াম শিল্পাঞ্চলে ইরানের চারটি ড্রোন হামলার কথা জানায় আবুধাবি।
ইরান চুক্তিতে আগ্রহী : ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান এখন সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তার দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাত না হলে তেহরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটি নিজেদের টিকিয়ে রাখতেই চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, এটি অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার ভাষায়, এই অবরোধ যেন ‘ইস্পাতের দেয়াল’, যা ভাঙার সাহস কেউ দেখাবে না। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজে হামলার প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাহাজটিতে গুলি চালানো হলেও সেটি চলাচল সক্ষম ছিল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত বহরের অংশ ছিল না।
ইরানের অবস্থানকে ‘দ্বিমুখী’ উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, একদিকে তারা আলোচনায় আগ্রহ দেখায়, অন্যদিকে প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দাবি করেন, দুর্বল অবস্থানের কারণেই দেশটি এখন চুক্তির পথে এগোতে চাইছে।
ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধবিরতি এখনো শেষ হয়নি : মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই বন্ধ করতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেন তিনি।
পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের সাময়িক এই অভিযানের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং ইরানের আগ্রাসন মোকাবিলা করা। তার দাবি, ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী দুটি জাহাজ সফলভাবে প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা প্রমাণ করে যে নৌপথ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে ইরান চাপের মুখে রয়েছে এবং তাদের ‘বিচক্ষণ আচরণ’ করা উচিত। একই সঙ্গে হেগসেথ পুনর্ব্যক্ত করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি এখনো শেষ হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অচলাবস্থা সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। এই সংঘাত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত সোমবার প্রায় ছয় শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে ঠেকেছে। গতকাল মঙ্গলবার দাম কিছুটা কমে গ্রিনিচ মান সময় রাত ২টা নাগাদ ১১৩ দশমিক ৫৪ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল।