কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আগামী ২৮ এপ্রিল থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটে প্রথমবারের মতো ফুয়েল লোডিং শুরু হচ্ছে। এটি একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এই ফুয়েল বা জ্বালানি বলতে পারমাণবিক জ্বালানি অর্থাৎ ইউরেনিয়ামকে বোঝায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত স্বল্পমাত্রায় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। ফুয়েল হিসেবে ব্যবহৃত এই ইউরেনিয়াম (ইউ-২৩৫) আড়াই থেকে পাঁচ শতাংশ মাত্রায় পরিশোধিত।
ফুয়েল লোডিং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ পর্যায় থেকে উৎপাদন পর্যায়ে উত্তরণেরই ইঙ্গিত। এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টরে ফ্রেশ ফুয়েল লোড করার মাধ্যমে কেন্দ্রটি সচল করার পথ তৈরি হবে। এর মাধ্যমেই প্রথম তাপ উৎপাদন ও পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানো যাবে। মূলত বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে ফুয়েল লোড করাই হলো চূড়ান্ত ধাপ।
১ নম্বর ইউনিটের জন্য ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল হলো ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইডের পেলেট। এই পেলেট হলো ছোট ছোট দানা। কয়লা বা তেলের মতো ইউরেনিয়ামের এই পেলেটগুলো থেকে তাপ উৎপন্ন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

প্রতিটি পেলেটের ওজন মাত্র সাড়ে ৪ থেকে ৫ গ্রাম। সহজে বলতে গেলে দুটি সিগারেটে যে পরিমাণ তামাক থাকে, তার ওজন ৫ গ্রাম। এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা এক টন কয়লা থেকে উৎপাদিত তাপের সমান। কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই মাত্র একটি পেলেট বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেলেটগুলোকে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবে রাখা হয়, যা ফুয়েল রড নামে পরিচিত। এই ফুয়েল রডগুলো কয়েক বছর রিয়্যাক্টর কোরের ভেতরে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পার হলে এগুলো পরিবর্তন করতে হয়।
অনেকগুলো রড গুচ্ছাকারে সাজিয়ে একটি ‘অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি প্রায় ৪ দশমিক ৬ মিটার বা ১৫ ফুটের মতো লম্বা এবং এতে প্রায় ৫৩৪ কেজি ফুয়েল (পরিশোধিত ইউরেনিয়াম) থাকে। ইস্পাত ও জিরকোনিয়ামের ভারসহ প্রতিটি রডের ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ কেজি এবং প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে এমন ৩১২টি রড সাজানো থাকে।
১ নম্বর ইউনিটের রিয়্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে, যা পানি দিয়ে ঠান্ডা রাখা হবে। ১৬৪টি অ্যাসেম্বলির (একটি অতিরিক্তসহ) প্রথম চালান ২০২৩ সালের অক্টোবরে পৌঁছায়। এর ফলে মূল ফুয়েল লোডিংয়ের আগেই প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও প্রস্তুতির কাজগুলো সেরে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ফুয়েল আগেভাগে চলে আসায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো, কাঠামোগত অখণ্ডতা যাচাই এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে তারা অ্যাসেম্বলিগুলোর কারিগরি দিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন এবং লোডিংয়ের পদ্ধতি ও কৌশলগুলো রপ্ত করার মাধ্যমে রিয়্যাক্টরে প্রথমবার ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পেরেছেন।

প্রথমবার পারমাণবিক ফুয়েল লোডিং আসলে কী?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি নবনির্মিত রিয়্যাক্টরের কোরে প্রথমবারের মতো অ্যাসেম্বলি স্থাপন করাই হলো ‘ প্রথম পারমাণবিক ফুয়েল লোডিং’। ফুয়েল লোডিং একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা। একটি রিঅ্যাক্টর নির্মাণ পর্যায় শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হয়ে ওঠে এই ধাপের মধ্য দিয়ে।
একটি ভিভিইআর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমিশনিং পরীক্ষাগুলো মূলত দুই ধাপে সম্পন্ন হয়— একটি পরিচালনার আগের প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা এবং অন্যটি সরাসরি পরিচালনা সংক্রান্ত (পারমাণবিক) পরীক্ষা। প্রথম ধাপে ফুয়েল লোড করার আগেই কেন্দ্রের প্রতিটি যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়।
সব প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করার পর পরিচালনাকারী সংস্থা যাচাই করে এবং সবকিছু সন্তোষজনক থাকলে অনুমোদন দেয়। এরপর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চূড়ান্ত ছাড়পত্র পাওয়ার পরই কেবল ফুয়েল লোড করা যায়।
প্রথমবার ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য অপারেশনাল রেডিনেস কী?
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবার ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য ‘অপারেশনাল রেডিনেস’ বা পরিচালনাগত প্রস্তুতি হলো একটি চূড়ান্ত ও দালিলিক নিশ্চয়তা। এটি নিশ্চিত করে যে প্রয়োজনীয় জনবল, বিদ্যুৎ ইউনিটের যন্ত্রপাতি, কাঠামো, কার্যপদ্ধতি, নিরাপত্তা বিধিমালা, সহায়ক অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি—সবকিছুই রিয়্যাক্টরে পারমাণবিক ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করলে ধরে নেওয়া যায় এই প্রস্তুতি চূড়ান্ত—
-
নিরাপত্তা, নকশা এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্ল্যান্ট সিস্টেমের নির্মাণ ও স্থাপন কাজ সম্পন্ন করা।
-
আইএইএর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে ফুয়েল বা জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও রিয়্যাক্টর চালুর পাশাপাশি পরিচালনাগত যে কোনো পরিস্থিতি সামলানোর জন্য পরিচালনাকারী সংস্থার পূর্ণ প্রস্তুতি।
-
সব প্রি-অপারেশনাল (এ-স্টেজ) কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, যা নিউক্লিয়ার কমিশনিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করে।
-
নিরাপদভাবে ইউনিট পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত, যোগ্য এবং অনুমোদিত জনবলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
-
প্রকল্প সংস্থা থেকে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন সিস্টেম, স্থাপনা এবং নথিপত্রের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর।
-
সব অপারেটিং প্রসিডিউর বা পরিচালনা পদ্ধতি এবং নথিপত্র চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদন।
-
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং সেফগার্ডস অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
-
বিএইআরএর লাইসেন্স ও অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্রসহ ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের রেগুলেটরি ক্লিয়ারেন্স বা অনুমতি পাওয়া।
-
পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র/স্বাধীন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যালোচনা (যেমন—আইএইএ প্রি-ওসার্ট) সম্পন্ন করা।
-
ডামি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির সফল পরীক্ষা এবং ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের মহড়া সম্পন্ন করা, যার মধ্যে রিফুয়েলিং সরঞ্জামের প্রস্তুতি যাচাইয়ের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

প্রথমবার ফুয়েল লোডিংয়ের সময় কী হয়?
প্রথমবার ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১ নম্বর ইউনিটের প্রশিক্ষিত ও যোগ্য অপারেটর এবং ফুয়েল হ্যান্ডলাররা রাশিয়ান ফেডারেশনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় একটি বিশেষ ফুয়েল লোডিং মেশিনের মাধ্যমে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিয়্যাক্টরের ভেতরে স্থাপন করবেন।
অনুমোদিত কার্যপ্রণালী অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন নিউট্রন মনিটরিং ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হবে এবং ‘সাবক্রিটিকালিটি’ বজায় রাখতে অ্যাসেম্বলি স্থাপনের ক্রমটি অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
কিন্তু এই ধাপে পৌঁছানো মানেই কাজ শেষ নয়। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া যেকোনো জাতীয় পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য কেবল নির্মাণকাজ বা কারিগরি ব্যবস্থার সফল সমাপ্তিই যথেষ্ট নয়, বরং একটি পূর্ণ সক্ষম পরিচালনাকারী সংস্থা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় জাতীয় অবকাঠামোর সমন্বয়ও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো নবাগত দেশগুলোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে নির্মাণ কাজ শেষ করে স্বতন্ত্র ও নিরাপদ পরিচালনার স্তরে উন্নীত হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই উত্তরণের জন্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় ও সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আইএইএর নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা অপরিহার্য।
মোহাম্মদ শৌকত আকবর, সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন