পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফা ভোটগ্রহণের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রচারণায় এলেন আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। প্রচারের একদম শেষ পর্বে এসে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে তিনি দেশ বাঁচাতে, কষ্টার্জিত স্বাধীনতা বাঁচাতে ভোট দেওয়ার আর্জি জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে আক্রমণও করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সামনে মুখ থেকে কথা বের হয় না মোদির। কাঁপতে শুরু করেন। তার মতো কাপুরুষ প্রধানমন্ত্রী দেখেনি ভারত।
রোববার (২৬ এপ্রিল) বালিগঞ্জে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ও বেলেঘাটায় কুনাল ঘোষের নির্বাচনি জনসভায় উপস্থিত ছিলেন কেজরিওয়াল। বালিগঞ্জে বাংলাতেই বক্তৃতা শুরু করেন তিনি। উপস্থিত জনতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে কেজরিওয়াল যখন ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেন, ‘আমি অল্প অল্প বাংলা বলতে পারি’, তখন গোটা চত্ত্বর করতালিতে ফেটে পড়ে। তিনি জানান, খড়গপুর আইআইটিতে পড়ার সুবাদে বাংলা শিখেছেন অল্প।
কেজরিওয়াল জানান, তিনি বাংলাকে যেটুকু বুঝেছেন, দেখেছেন, তা থেকে বলতে পারেন, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা বাংলার সংস্কৃতি বোঝেন না। বাংলার ওপর হামলা হলে, বাঙালি মজা দেখাতে জানেন।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে ‘দেশের লড়াই’ বলেও উল্লেখ করেন কেজরিওয়াল। তিনি বলেন, ‘এটা কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। আপনারা দেশের জন্য লড়াই করছেন। বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, বামের নির্বাচন নয়। এটা দেশ বাঁচানোর নির্বাচন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলা থেকেই সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ বিসর্জন দেন। আজ সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার লড়াই। গোটা দেশ এই মুহূর্তে বাংলার দিকে তাকিয়ে। আমি দিল্লি থেকে আপনাদের পাশে দাঁড়াতে এসেছি, যাতে সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসুর মতো আগামী দিনে যখন ইতিহাস লেখা হবে, তাতে আপনাদের লড়াইয়ের কথা থাকবে। পাশাপাশি, উল্লেখ থাকবে যে কেজরিওয়ালও একদিন সেই লড়াইয়ে অংশ নিতে এসেছিলেন।
বালিগঞ্জে দাঁড়িয়ে মোদিকে তীব্র আক্রমণ করেন কেজরিওয়াল। তিনি বলেন, গোটা দেশে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন মোদি। দেশে ঘৃণা ছড়িয়েছেন, দেশকে বরবাদ করে দিয়েছেন। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, অশান্তি লেগে রয়েছে। যেখানেই যান সুরক্ষা নেই। সোশ্যাল মিডিয়া মিমে ভরে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প রোজ গালি দেন। তার সামনে মুখ থেকে কথা বেরোয় না মোদির। কাঁপতে শুরু করেন। এত কাপুরুষ প্রধানমন্ত্রী দেখেনি দেশ। নির্বাচনে জেতা মুশকিল হয়ে গেছে মোদি-শাহের। তাই ষড়যন্ত্র রচনা করলেন যে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দাও, ভুয়ো লোক ঢোকাও। বাংলার ২৭ লাখের নাম কেটে দিয়েছে। এই সংখ্যাটা কম নয়। বিজেপিকে ভোট দিলে ওই ২৭ লাখের কী হবে, ভগবানই জানেন। শুধু মমতা দিদি বাঁচাতে পারেন। বিজেপি ভয়ংকর। যাদের নাম কেটেছে, তারা কোনো সরকারি সুবিধা পাবেন না, রেশন কার্ড বাতিল। তাই বাদ যাওয়া ২৭ লাখ মানুষকে বলব, ঘরে ঘরে তৃণমূলের কর্মী হয়ে যান। মমতার সমর্থনে ভোট এলে তবেই জীবন বাঁচবে। বিজেপি এলে শেষ করে দেবে সব।
পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ ‘ভুয়া ভোটার ঢোকানো’ হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন কেজরিওয়াল। তিনি বলেন, এভাবে ভোটে জিততে চান মোদি। কারণ, সততার সঙ্গে হলে জিতে পারবেন না। মোদির তিন ইয়ার-ইডি, সিবিআই, জ্ঞানেশ কুমার। এত বেইমানির পর…গোটা দেশ থেকে আর্মি এনেছে। কী প্রয়োজন? বাংলার লোক কি সন্ত্রাসবাদী? বাংলার মানুষকে অপমান করছেন। আড়াই লাখ সেনা নামিয়েছে বাংলায়। এভাবে জিততে চান। ইডি, সিবিআই, জ্ঞানেশ কুমারকে লাগিয়েছে। তারপরও যদি হেরে যান, বাংলার মানুষ জানতে চান, ইস্তফা দেবেন তো মোদি? ইডি, সিবিআই, জ্ঞানেশ কুমার, নির্বাচন কমিশন, বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সবাই ঘুরছেন। এত লোক কেন? এক দিদিকে হারাতে। খাটো চেহারার এক মহিলা। কিন্তু হাঁটেন বেশ জোরে। এক নারী, সব পে ভারী। একা সবাইকে হারিয়ে দেন।
তিনি আরও বলেন, এক বছর আগে দিল্লিতে নির্বাচনের সময় আমার নামে মিথ্যে ঘুষের মামলা দিয়েছে, জেলে রেখেছে ছয় মাস। আদালত রায় দিয়েছে, কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। কেজরিওয়াল সৎ, দুর্নীতি করেননি। মিথ্যে মামলা দিয়ে, জেলে ঢুকিয়ে দিল্লি দখল করেছে। যত ভালো কাজ করেছিলাম, সব বন্ধ করে দিয়েছে। গত এক বছরে পস্তাচ্ছেন দিল্লিবাসী।
রাজ্যে ক্ষমতায় এলে মমতার আমলের সব প্রকল্প চালু থাকবে বলে বিজেপি নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, দিল্লিতেও নারীদের ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। এক বছর হয়ে গেছে। এখনও দেয়নি।
তার ভাষ্য, সবচেয়ে মিথ্যাবাদী প্রধানমন্ত্রী। শুধু মিথ্যা বলেন। আমি দিল্লি থেকে এসেছি। বিশ্বাস করবেন না। এখন বলছে ৩ হাজার টাকা দেবে। দেবে না। ওখানে সিলিন্ডার দেবেও বলেছিল। দেয়নি। দিদি বাংলার জন্য, দেশের জন্য লড়ছেন। সবাইকে বলব, এটা দলের নির্বাচন নয়, দেশ-গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। দিদিকে ভোট দিন।
বালিগঞ্জের পর বেলেঘাটার পর বেলেঘাটার সভাতেও এদিন আগাগোড়া আক্রমণাত্মক ছিলেন কেজরিওয়াল। শুরু থেকে তোপ দাগেন বিজেপি ও কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে। তিনি সাফ জানান, এই লড়াই সাধারণ কোনো ভোট নয়; বরং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার শেষ সুযোগ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি-তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল্লির সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি কেউ সন্ত্রাসবাদী যে বাংলায় এত বিপুল পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হয়েছে? আসলে এই বাহিনীর ভয় দেখিয়ে মানুষের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে।