যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছে দেশটির পুলিশ। নিহত জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও অপর নিখোঁজ শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির (২৭) সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। তবে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ ধারণা করছে, নাহিদাকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-এর প্রতিবেদক ক্রিস হার্স্টকে জানিয়েছেন, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের পরিবারকে পুলিশ জানিয়েছে, জামিল লিমন ও অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার শেয়ার করা ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর পরিমাণ রক্ত’ পাওয়া গেছে। এই রক্তের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তদন্তকারীরা মনে করছেন নাহিদা বৃষ্টি আর বেঁচে নেই।
জাহিদ হাসান প্রান্ত আরও জানান, পুলিশ তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে নাহিদার মরদেহ হয়তো কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর তার মরদেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করা হয়েছে, এটি উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পর সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে আই-২৭৫ নর্থ রোডের ব্রিজের পাশে একটি মরদেহের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার অভিযান চলাকালে ব্রিজের ওপর দীর্ঘ আট ঘণ্টা যান চলাচল সীমিত থাকায় এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুর পৌনে ২টার দিকে রাস্তা স্বাভাবিক হয় এবং ২টার দিকে মরদেহটি নিখোঁজ জামিল লিমনের বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে কর্তৃপক্ষ।
লিমনের মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পরই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় একটি ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ বা পারিবারিক সহিংসতার কল পায় পুলিশ। কলটি ছিল লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়ি থেকে। পুলিশ সেখানে পৌঁছালে হিশাম ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ টিম তলব করা হয়। এ সময় বাড়িতে থাকা হিশামের পরিবারের অন্য সদস্যরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টার পর সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটের দিকে সোয়াট টিমের কাছে আত্মসমর্পণ করেন হিশাম।
চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রেপ্তারকৃত হিশামের বিরুদ্ধে ছয়টি সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— পারিবারিক সহিংসতা, সাধারণ প্রহার, কাউকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা, কারও মৃত্যু সংবাদ পুলিশকে না জানানো এবং বেআইনিভাবে মৃতদেহ সরানো বা নাড়াচাড়া করা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হিশাম ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউএসএফ-এর ম্যানেজমেন্ট বিভাগে বিএসসি কোর্সে পড়তেন, তবে বর্তমানে তিনি শিক্ষার্থী নন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি অ্যাপার্টমেন্টে লিমনের সাথে রুমমেট হিসেবে থাকতেন।
সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েমের এক বার্তার বরাত দিয়ে কিছু স্থানীয় সূত্রে দাবি করা করেছে, হিশাম সালেহ আবুগারবিয়া যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। যদিও পারিবারিকভাবে তিনি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত বলে জানা গেছে।
লিমনের মরদেহ উদ্ধার ও রুমমেট গ্রেপ্তার হলেও ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ থাকা নাহিদা বৃষ্টি খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। ওই দিন সকাল ১০টায় ইউএসএফ ক্যাম্পাসের এনইএস ভবনের সামনে তাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদার বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত জানিয়েছেন, লিমন ও নাহিদার মধ্যে অতীতে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে তাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই। গত শুক্রবার বিকেলে এক পারিবারিক বন্ধু তাদের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন।