যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল রাতে ইসলামাবাদের উদ্দেশে তেহরান ত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র। অন্যদিকে দ্বিতীয় দফার আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে একটি ভালো ও চৌকশ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। শান্তি আলোচনার আভাসের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আবারও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও জেরার্ড আলফোর্ডের পর নতুন করে আরেকটি বিমানবাহী রণতরি ওমান উপসাগরে পাঠিয়েছে পেন্টাগন। চুক্তিতে রাজি না হলে এসব রণতরি থেকে ইরানের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে মার্কিন নৌ অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের বন্দরে ভিড়েছে একটি পণ্যবাহী জাহাজ। পাকিস্তানের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে দেশটির একটি প্রতিনিধিদল গতকাল রাতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
এর আগে গতকাল দিনের শুরুতে টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফোনে দুই নেতা আঞ্চলিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইসহাক দার নিরবচ্ছিন্ন আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে আরাগচি পাকিস্তানের ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও পৃথকভাবে ফোনে কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এই ফোনালাপের বিষয়ে কোনো তথ্য নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ ও পাশের শহর রাওয়ালপিন্ডিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইসলামাবাদে দুটি হোটেল বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসতে ইরান এ পর্যন্ত রাজি হয়নি। কিন্তু আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অন্তত ৯টি মার্কিন বিমান যোগাযোগ সরঞ্জাম, যানবাহন, নিরাপত্তা কর্মী এবং কারিগরি জনবল নিয়ে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।
ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে একটি ভালো ও চৌকশ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। গতকাল পেন্টাগনে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৪টি জাহাজকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ আরও কঠোর হচ্ছে। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে। এখন আর কোনো কিছুই ইরানের বন্দরের ভিতরে ঢুকবে না বা বাইরে আসবে না। তিনি আরও বলেন, আমাদের এই অবরোধ কেবল বিস্তৃত হচ্ছে না, বরং এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ বজায় থাকবে। আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় আছে এবং আমরা চুক্তি করার জন্য মোটেও উদ্বিগ্ন বা তাড়াহুড়ো করছি না। নৌ-অবরোধ ঘিরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একপেশে দাবির মাঝেই পাল্টা তথ্য জানিয়েছে ইরান। গতকাল অবরোধ উপেক্ষা করে একটি পণ্যবাহী জাহাজ ইরানের বন্দরে ভিড়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, ওমান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করার চেষ্টা ব্যর্থ করে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছেছে একটি ইরানের পণ্যবাহী জাহাজ। চালবাহী জাহাজটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ-ইউনিট। মূলত মার্কিন বাহিনীর কবজা থেকে জাহাজটিকে রক্ষা করতেই এই বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়।
সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার আভাসের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক শক্তি জোরদার করছে মার্কিন বাহিনী। গতকাল মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ভারত মহাসাগর থেকে ওমান উপসাগরে পৌঁছেছে। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরির সমাবেশ ঘটাল যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এর আগে বৃহস্পতিবার সেন্টকম জানায়, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরিসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬টি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন; ১২টি ডেস্ট্রয়ার; দুটি কমব্যাট শিপ ও তিনটি অ্যাম্ফিবিয়াস গ্রুপ (ইউএসএস ত্রিপোলি, ইউএসএস নিউ অরলিন্স ও ইউএসএস রাশমোর)। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরে আলাদাভাবে আরও সাতটি যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে।
আক্রান্ত হলে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের : ইরানের তেল ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সমপরিমাণ পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাঈল সাকাব এসফাহানি। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ যদি আবারও কোনো ভুল করে, তবে আমাদের কৌশল হবে ‘চোখের বদলে চোখ’। আমাদের কোনো তেলকূপে আঘাত করা হলে, যে দেশের মাটি ব্যবহার করে আমাদের ওপর আক্রমণ চালানো হবে, সেই দেশের তেল স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
শান্তি আলোচনা প্রসঙ্গে সাকাব এসফাহানি বলেন, আলোচনার টেবিলে ইরানের প্রতিনিধিদল শত্রুর কলার চেপে ধরেছে।