শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে তার মেয়াদ ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাকিস্তানের অনুরোধে তিনি এটা করেছেন বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত’ ইরানি নেতৃত্বকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য ‘ইউনিক প্রস্তাব’ তৈরির সময় দিতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা যখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন এমন মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
উল্লেখ্য, ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ অব্যাহত থাকায় শেষ মুহূর্তে এই সংলাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় ইরান। এতে শুরু হয় ঝড়ো কূটনীতি। গতি বাড়তে থাকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করেনি। ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে তার পরামর্শই এই কৌশল পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ লিখেছেন, ইরান সরকারের ভেতরে গুরুতর বিভাজন রয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত নয়। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের অনুরোধের ভিত্তিতে আমরা ইরানের ওপর আমাদের আক্রমণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছি, যতক্ষণ না তাদের নেতারা একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব দিতে পারে।
তবে তিনি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের উপকূলীয় বন্দরগুলোর অবরোধ বহাল থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্য সব ক্ষেত্রে প্রস্তুত ও সক্ষম থাকবে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধবিরতি চলবে ‘যতক্ষণ না প্রস্তাব জমা পড়ে এবং আলোচনা শেষ হয়- যেভাবেই হোক না কেন।
পাকিস্তান কী বলেছে
পরে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ গ্রহণ করা এবং পাকিস্তানের ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর আস্থা রাখার’ জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তিনি এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে এবং ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসিম মুনিরের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি আমাদের অনুরোধ গ্রহণ করে যুদ্ধবিরতি বাড়িয়েছেন, যাতে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে যেতে পারে। পাকিস্তান এই আস্থার মর্যাদা রাখতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং ইসলামাবাদে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে। যদি সত্যিই পাকিস্তান ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী হামলা স্থগিত রাখতে প্রভাবিত করে থাকে, তাহলে তা দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে বড়ভাবে শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। এর আগে ইরানের নেতারাও বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
কীভাবে ‘শান্তি মধ্যস্থতাকারী’ হলো পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দূরত্ব কমাতে পাকিস্তানের তৎপরতার পেছনে রয়েছে নিজেদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ইসলামাবাদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, এটি আঞ্চলিক শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি ও উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরতার কারণে পাকিস্তানকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং বিনিময় হার চাপের মুখে পড়ে। ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়। প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শিল্প খরচ বাড়বে, ব্যবসায়িক আস্থা কমবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ‘দায়িত্বশীল মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। গত সপ্তাহে তেহরান সফরে গিয়ে ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিষয়ে অগ্রগতি আনেন, যদিও তা স্থায়ী হয়নি।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য লাভ
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে একটি দুর্বল অর্থনীতি ও সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্র হিসেবে সমালোচিত। তবে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ইসলামাবাদ মনে করে, তারা তাদের প্রকৃত ক্ষমতার তুলনায় কম প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশ্ব যখন বহুমুখী শক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন পাকিস্তানের নেতারা সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চাইছেন। সম্প্রতি দেশটি বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং সৌদি আরব থেকে জরুরি ৩০০ কোটি ডলারের ঋণের মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আশা করছে ইসলামাবাদ। অসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েকটি অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে। যদি এই আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে, তাহলে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আলোচনা ভেঙে গেলে ব্যর্থতার একটি অংশ পাকিস্তানের ওপরও আসতে পারে। ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, ইসলামাবাদ নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এগিয়ে নিচ্ছে, যা দেশের ভেতরেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
কীভাবে এই ভূমিকা পেল পাকিস্তান
এই সুযোগ আসে তখন, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী খুঁজছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে হোয়াইট হাউসে এক আকস্মিক সফরের পর অসিম মুনির এই দায়িত্ব নেন বলে জানা যায়। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও মজবুত হয়। বিশেষ করে গত বছরের ১২ দিনের ইসরাইল যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সমর্থনের কারণে। সাবেক কূটনীতিক আলী সারওয়ার নাকভি বলেন, ইরান জেনেভা বা ভিয়েনার মতো ইউরোপীয় শহরগুলোতে আলোচনায় আস্থা রাখে না। পাকিস্তানের ওপর তাদের আস্থা বেশি। আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত জামির আকরম বলেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ওয়াশিংটনে ইরানের স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভারতের জন্য কী বার্তা
স্বল্পমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শেষ হওয়া ভারতের জন্য ভালো খবর- যে-ই মধ্যস্থতা করুক না কেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে কিছু উদ্বেগ থাকতে পারে। কারণ, কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তান ভারতের স্বার্থে ছিল। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্য দেশটির সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও বাড়াতে পারে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব নয়াদিল্লির প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া, ‘শান্তির মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হতে পারে, বিশেষ করে যদি অস্ত্র বিক্রির সুযোগ বাড়ে।