যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতেরা ওয়াশিংটন ডিসিতে আলোচনায় বসার পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) একদিকে যখন আলোচনা চলছিল, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় এদিন দিনভর ইসরায়েলের বিমান হামলা চলেছে এবং রাতেও তা অব্যাহত রয়েছে। টাইর ও আল-আব্বাসিয়েহ এলাকায় হামলা হয়েছে, যেখানে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। খবর আল জাজিরার।
খবরে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সালের পর প্রতিবেশী এই দুই দেশের কূটনীতিকরা প্রথমবার এমন মুখোমুখি আলোচনায় বসলেন। আলোচনা তেমন একটা ফলপ্রসূ না হলেও ইসরায়েল ও লেবানন ‘উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত সময়ে ও স্থানে’ পরবর্তী দফার বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মুখপাত্রের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার প্রথম এই সরাসরি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র আশা প্রকাশ করেছে যে, এই সংলাপ ২০২৪ সালের চুক্তির পরিধি ছাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এ-ও বলে রেখেছে, শত্রুতা অবসানের যেকোনো চুক্তি অবশ্যই দুই দেশের সরকারের মধ্যে হতে হবে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকতে হবে; অন্য কোনো পথে পৃথকভাবে আলোচনা করা যাবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে যে, এই আলোচনার মাধ্যমে লেবাননের জন্য বড় ধরনের পুনর্গঠন সহায়তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ খুলে যেতে পারে এবং উভয় দেশের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।
এদিকে আলোচনার পরও দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলের হাজারো সেনা মোতায়েন রয়েছে। তারা উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে, যাকে তারা এখন ‘অ্যান্টি-ট্যাংক লাইন’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই দূরত্ব প্রায় ৪ থেকে ৬ কিলোমিটার, যা অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে পড়ে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ যাতে ইসরায়েলে হামলা চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যেই তারা এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এই অভিযানের অংশ হিসেবে কয়েক দিন ধরে বিনত জবেইল শহর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, শহরটি ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। স্যাটেলাইট চিত্র এবং শহরের কেন্দ্রে ইসরায়েলি ট্যাংক দেখা যাওয়ার খবরও এ দাবির পক্ষে সমর্থন জোগাচ্ছে।
এ ছাড়া বিনত জবেইলে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, যা ঘরবাড়ি ধ্বংস করার অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, এখানেও তা অনুসরণ করছে ইসরায়েল। এতে ঘরবাড়িতে বিস্ফোরক স্থাপন করে তা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সীমান্ত অঞ্চলের এসব বসতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
আলোচনায় বাগড়া দিচ্ছে হিজবুল্লাহ
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এই আলোচনার মাধ্যমে লেবানন যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে চাইছে, আর ইসরায়েলের লক্ষ্য লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা। তবে হিজবুল্লাহর আপত্তিতে এরইমধ্যে আলোচনার ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনাকে ‘উন্মুক্ত, সরাসরি ও উচ্চপর্যায়ের’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে সমাধানের পথ সংকীর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে, কারণ হিজবুল্লাহ আগেই এই আলোচনাকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়ে লেবানন সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহ নেতা কাসেম নাঈম সোমবার বলেন, এই আলোচনা আসলে সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে অস্ত্র সমর্পণে চাপ দেওয়ার কৌশল। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতেই ইসরায়েল লেবাননে হামলা জোরদার করেছে, যাতে অন্তত ২ হাজার ৮০ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে যুদ্ধ থামায়নি ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার মধ্যস্থতাকারী। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘হিজবুল্লাহর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের’ পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈঠক জরুরি। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করছে, লেবাননের সঙ্গে নয়—তাই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কথা বলায় বাধা থাকার কথা নয়।’
লেবানন-ইসরায়েল সহিংসতা তীব্র পর্যায়ে যাওয়ার পর এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবাননের বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় হামলার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে।
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অন্তত ২ হাজার ৮৯ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৬৫ শিশু ও ৮৭ জন চিকিৎসাকর্মী রয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখের বেশি মানুষ।