Image description

Sabina Ahmed (সাবিনা আহমেদ)

 
 
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাগায়ী ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের কাছে পরিষ্কার করে বলেছেন:
 
“- আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে আমাদের উত্থাপিত ১০-দফা এবং অপর পক্ষের উত্থাপিত প্রস্তাবাবলির বিবিধ বিষয় নিয়ে।
- আমরা বেশ কিছু বিষয়ে একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি; তবে দুই বা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকায়, শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা কোনো চুক্তিতে রূপ নেয়নি।”
আমার একই প্রেডিকশন ছিলো যে কিছু কিছু পয়েন্টে আলোচনা সাপেক্ষে উভয় দেশ রাজি হবে, কিন্তু সব বিষয়ে পূর্ণ বোঝাপড়া সম্পন্ন করতে দুই সপ্তাহ যথেষ্ট সময় নয়। ৪০ দিনের যুদ্ধ, এবং দুই দফা আমেরিকা আলোচনার মাঝে ইরানকে আক্রমণ করার পর ইরানের মনে আমেরিকার প্রতি যে অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, সেই পরিবেশে এক রাউন্ডে সবকিছু মিটিয়ে ফেলা অসম্ভব ছিল।
 
আমেরিকার আশা ছিলো ইরান গতকাল নিউক্লিয়ার পয়েন্টে নিজেদের নিউক্লিয়ার অস্ত্র না বানানোর ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পয়েন্ট তাৎক্ষণিক রাজি হবে। কিন্তু ইরান রাজি হয়নি, তারা বলেছে নিউক্লিয়ার পয়েন্টটি অনেক জটিল এবং আমাদের সার্বভৌমত্বের বিষয়, এর জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন। তাই আমেরিকা কথা না বাড়িয়ে কোনো পয়েন্টেই চুক্তি না করে ফিরে গেছে। এছাড়া, ইরানের ১০-দফা প্রস্তাবের সঙ্গে মার্কিনদের প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার আর ক্ষতিপূরণ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এখনো ফাঁক রয়ে গেছে।
 
আমেরিকা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেগোসিয়েশন করে, কিন্তু ইরান প্রতিটা বাক্য, প্রতিটা শব্দ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে ডিপ্লোম্যাসি চালায়—যা সময়সাপেক্ষ। আমেরিকার ধৈর্য কম, ইরানের ধৈর্য অনেক বেশি। এই দুই পক্ষের মধ্যে যারা মধ্যস্থতা করছে, পাকিস্তান, আল্লাহ তাদের দিয়েছেন অসীম ধৈর্য আর উইল পাওয়ার। না হলে এই জটিল পরিস্থিতিতে একদিনের আলোচনায়ও এতটা অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
এদিকে মিটিং শেষ হতেই ট্রাম্প ও পেন্টাগন ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে—আমেরিকান মাইন সুইপার জাহাজ আর যুদ্ধজাহাজ ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে পাঠানো শুরু হয়েছে। যদিও জাহাজগুলোকে আইআরজিসি এর ফাইনাল ওয়ানিং এর পর হরমুজ থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে। তবে ঘোষণা মতে আগামী কাল থেকে আমেরিকান সুইপার জাহাজ মাইন ক্লিয়ার করবে, আর ইরানিরা যদি কোনোভাবে বাধা দেয়, তাহলে তাদের উপর “হেল নামিয়ে আনবে”, অর্থাৎ, সরাসরি বোমা বর্ষণ করা হবে। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে স্পষ্ট লিখেছেন, “ইরানিরা যদি আমাদের জাহাজে গুলি করে, তাদেরকে উড়িয়ে দেওয়া হবে।”
 
এয়ার যুদ্ধের পর এবার শুরু হলো আমেরিকার নেভি আর আইআরজিসির নেভির মধ্যে সরাসরি সংঘাতের তীব্র ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালীতে এখনো পূর্ণ যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠেনি, কিন্তু উত্তেজনা এখন চরম সীমায়। একটি ক্ষুদ্রতম ভুলই পুরো অঞ্চলকে আগুনের সমুদ্রে ডুবিয়ে দিতে পারে।
 
এদিকে হেজবল্লাহ ও হুথিরা স্পষ্ট বলছে যে ইসরায়েল সিজফায়ার ভঙ্গ করেছে। গত মধ্যরাতে হেজবল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের দুটি শহর, কিরিয়াত শমোনা ও সাফেদ এলাকাসহ, লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু রকেট বর্ষণ করেছে। অলমোস্ট প্রতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর। তারা বলছে, “ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের গ্রাম ও সেনা অবস্থানে বারবার আক্রমণ চালিয়ে সিজফায়ার লঙ্ঘন করেছে, তাই আমরা প্রতিরোধ করছি।” একটি হামলায় অফিসিয়ালি জন ইসরায়েলি সৈন্য আহত হয়েছে। অনফিশিয়ালি সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা।
 
হুথিরাও বলছে, ইজরায়েলের লেবানন বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবানন সিজফায়ারের “স্পষ্ট লঙ্ঘন” এবং হুমকি দিয়েছে যে যেকোনো মুহূর্তে তারা রেড সি ফ্রন্টে আবার পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ শুরু করতে পারে।
কেবল ইরানের উপর সরাসরি আক্রমণ এখন বন্ধ আছে। বন্ধ আছে জিসিসি দেশগুলোর উপর ইরানের আক্রমণ। সিজফায়ার এর টাইম শেষ হতে আরও ৯ দিনের মতন বাকি আছে।
পাকিস্তান, ওমান ও কাতার বলছে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। তারা উভয়পক্ষকে আবারও আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতির সমাধান একমাত্র কূটনৈতিকভাবেই সম্ভব। কোনো রকম বলপ্রয়োগে ইরানের মাথা নত করা সম্ভব বলে মনে করি না। ইরান অত্যন্ত পুরাতন একটি সিভিলাইজেশন, এবং প্রাউড নেশন।
 
বাই দ্য ওয়ে, চীন সমুদ্রপথে ইরানকে ম্যানপ্যাড, ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, পাঠাচ্ছে বলে আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট করেছে। এগুলো একজন মানুষের কাঁধে ধরে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও নিচু উড়ন্ত বিমান ধ্বংস করতে পারে। তৃতীয় কোনো দেশের, সম্ভবত পাকিস্তানের মাধ্যমে, এই সরবরাহ হচ্ছে।
 
রাশিয়াও বলেছে, সামনের যুদ্ধের জন্য ইরানের যত অস্ত্র দরকার তা পাঠাবে। রাশিয়া এর চীন যেখানে স্যাটেলাইট ইনটেলিজেন্স দিয়ে আইআরজিসিকে মিসাইল হামলায় সাহায্য করছে, পাকিস্তানের আইএসআই সাহায্য করছে ইরানের ভিতরে ইসরায়েলের পক্ষে যেসব এজেন্ট কাজ করছে তাদের ধরতে। পাকিস্তান এই সহায়তা দিচ্ছে প্রথম ইরান বনাম ইজরায়েল/আমেরিকার ১২ দিনের যুদ্ধের সময় থেকেই। সেজন্যই ইরান পাকিস্তানকে বিশ্বাস করে, যদিও ইরানের সাথে সৌদি আরবের মিলিটারি এলায়েন্স আছে, আর ইরান -সৌদি আর নট বন্ধু রাষ্ট্র, বরং তারা একে অপরকে প্রচণ্ড অবিশ্বাস করে। সেজন্যই পাকিস্তান প্রথম সিজফায়ার মিটিং ডাকতে পারার আর মধ্যস্থতা করার মতন পজিশনে ছিলো।
 
ইরান আর তার মিত্ররা সামনে একটা গ্রাউন্ড যুদ্ধের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের সাথে চীনের তুর্কমেনিস্তান হয়ে ট্রেন লাইনের সরাসরি যোগাযোগ আছে, আর রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে ক্যাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইরানের বন্দর আঞ্জালি দিয়ে রাশিয়া-ইরান তাদের সরবরাহ পাঠায়। তাই এসব দেশের মধ্যে অস্ত্র চলাচল করে এমন রুটে , যা ধরা বা কনফিসকেট করা অলমোস্ট অসম্ভব।
যদিও যুদ্ধ কেউ চায় না, কিন্তু কিছুদিন পরপর এক দেশ অপর দেশকে আক্রমণ করে ক্ষয়ক্ষতি করবে—তাও কেউ চায় না। তাই একবারের যুদ্ধেই যদি দুই দেশের মাঝে সামনের ৫০ থেকে ১০০ বছরের যুদ্ধ বন্ধ হয়, তাহলে সেরকম এক যুদ্ধই মোর প্রাকটিকাল।