‘চারিদিকে শুধু বোমা আর বোমা। যে দিকে যাই সে দিকেই আগুন। বড় বড় গর্ত আর ক্ষত চিহেৃ ভরপুর ইরান। যে দিকে যাই সে দিকে আতঙ্ক আর উদ্বেগ। চারদিকে শুধুই বিকট শব্দ। কিছুই বুঝতে পারছি না। পরে জানতে পারি যুদ্ধ লাগছে। কারখানা থেকে বের হয়ে দেখি আগুনের কুল্লী আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশ। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে আমাদের কারখানার পাশেই মিসাইল মারছে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২০ দিন ভয়াল যুদ্ধের কথা জানাচ্ছিলেন মো. মামুন। বোমার শব্দে আমার কান সমস্যা হচ্ছে। এখন আমি ভালো ভাবে শুনতে পাই না। ঘুমের মধ্যে আমি এখনও বোমার শব্দ শুনতে পাই।
তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি রাতও ঘুমাতে পারিনি। কখন কী হয়, প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকি। ঠিকমতো মুখ দিয়ে খাবার যাচ্ছে না। মানসিক অবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। কী করবো মাথায় কাজ করছিল না। দেশেও যোগাযোগ করতে পারছি না। পরিবার কেমন আছে তাও জানি না। ইন্টারনেট সেবা ছিল বিচ্ছিন্ন। হাতেও নেই তেমন পয়সা-কড়ি। বাসায় নেই খাবার-দাবার। কোনোরকম রুটি খেয়ে দিন পার করছি। এগারো বছর পূর্বে দেশ থেকে জীবিকার তাগিদে ওমান যান মামুন। সেখানে কোনো সুযোগ-সুবিধা করতে না পেরে অবৈধ পথ অবলম্বন করে ইরানে পাড়ি জমান। এরপর টানা এগারো বছর ইরানে বসবাস করে আসছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে মো. মামুন।
মামুন বলেন, ইরান যুদ্ধের কথা মনে হলে ঘুমের মধ্যে এখনো আঁতকে ওঠি। নিজ চোখে যে ভয়ানক দৃশ্য দেখে এসেছি, তা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন কাজে ছিলাম। হঠাৎ শুনি বাইরে বিকট শব্দ। তবে কারখানার মেশিনের আওয়াজে প্রথমে তা বুঝে ওঠতে পারিনি। বাইরে বের হয়ে দেখি আগুন আর আগুন। মানুষ দিগিবেদিক ছোটাছুটি করছে। ওই সময় আমিও দৌড়ে সেখান থেকে অন্যস্থানে যাই। এ সময় অনেকেই আহত হন। আমি নিজেও মারাত্মকভাবে পায়ে আঘাত পেয়েছি।
তিনি জানান, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এক রুমে পার করেছি। সবসময় আতঙ্কে ছিলাম। মিসাইলের বিকট শব্দ রুম থেকে শুনতাম। কিছু করার ছিল না। বের হওয়ারও সুযোগ নেই। কী এক ভয়ানক পরিস্থিতি। কষ্টের কথা কি বলবো, ৩-৪ দিন না খেয়েই দিনাতিপাত কাটিয়েছি। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। ওদিকে ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে কারখানায় মালিকও আসছে না ঠিকমতো। দিনের পর দিন এভাবেই না খেয়ে থেকেছি। কিছুদিন পর শুনি ইরানে অবস্থিত বাংলাদেশি অ্যাম্বাসির মাধ্যমে দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ খবর শোনার পর কিছুটা স্বস্তি পেলাম। যখন মাতৃভূমিতে পা রাখি তখন মনে হলো নতুন এক জীবন ফিরে ফেলাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তরিকতা আর ইরানে বাংলাদেশি এম্বাসির সহযোগিতায় জন্মভূমিতে আসার সৌভাগ্য হয়েছে।