Image description

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের যুগে সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে এক বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিল নিউ ইয়র্ক টাইমস। এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরশীলতার দায়ে পত্রিকাটির দীর্ঘদিনের ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক অ্যালেক্স প্রেস্টনকে ছাঁটাই করেছে কর্তৃপক্ষ।

পত্রিকাটির তদন্তে ধরা পড়েছে, প্রেস্টন একটি বইয়ের সমালোচনা লিখতে এআই ব্যবহার করেছিলেন, যা অসাবধানতাবশত একই বই নিয়ে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনার অংশবিশেষ নিজের লেখায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যমটি।

ঘটনার সূত্রপাত গত জানুয়ারি মাসে। প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক জঁ-ব্যাপটিস্ট আন্দ্রিয়ার সাড়া জাগানো বই ‘ওয়াচিং ওভার হার’-এর ওপর একটি সমালোচনা লিখেছিলেন প্রেস্টন।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখন, যখন এক পাঠক লক্ষ্য করেন— এই পর্যালোচনার বেশ কিছু অংশ গত আগস্টে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ক্রিস্টোবেল কেন্টের লেখা একটি পর্যালোচনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

বিশেষ করে উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র ‘স্টেফানো’-র বর্ণনা এবং ইতালির প্রেক্ষাপট নিয়ে করা চূড়ান্ত মূল্যায়নগুলো ছিল প্রায় অবিকল। গার্ডিয়ানে যেখানে ইতালিকে ‘বিরোধপূর্ণ দেশের প্রতি ভালোবাসার গান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, প্রেস্টনের লেখাতেও সেই একই অলঙ্কার ও শব্দচয়ন ফুটে ওঠে।

বইটির শেষ মূল্যায়নে গার্ডিয়ানে লেখা ছিল— বইটি মূলত ‘বিরোধপূর্ণ একটি দেশের প্রতি ভালোবাসার গান; যা বিধ্বস্ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিভক্ত, পথভ্রষ্ট ও অলৌকিক: এমন এক ইতালি যেখানে জীবন মানেই ছদ্মবেশ ও শিল্পের পারফরম্যান্স এবং যেখানে পরিত্যক্ত জমিতে সার্কাস গড়ে ওঠে।’

নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংস্করণেও লেখা হয়, চরিত্রগুলো ‘শেষ পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ এক দেশের ভালোবাসার গানে বিচরণ করে: যা বিধ্বস্ত, বিভক্ত, পথভ্রষ্ট ও অলৌকিক। এটি এমন এক ইতালি যেখানে জীবন মানেই পারফরম্যান্স এবং যেখানে পরিত্যক্ত জমিতে সার্কাস জেগে ওঠে।’

গার্ডিয়ানের রিভিউ থেকে হুবহু নেওয়া অংশের মধ্যে চরিত্রের বর্ণনাও রয়েছে—যেমন গার্ডিয়ানে লেখা ছিল ‘lazy Machiavellian Stefano’, যা নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংস্করণেও একইভাবে দেখা যায়।

বিষয়টি সামনে আসার পরপরই নিউ ইয়র্ক টাইমস কর্তৃপক্ষ এক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে। সেখানে লেখক অ্যালেক্স প্রেস্টন স্বীকার করেন, তিনি রিভিউটি লিখতে এআই-এর সাহায্য নিয়েছিলেন এবং জমা দেওয়ার আগে তিনি লক্ষ্য করেননি— এআই সেখানে দ্য গার্ডিয়ানের কিছু অংশ হুবহু যুক্ত করে দিয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস গত সোমবার একটি ইমেলের মাধ্যমে দ্য গার্ডিয়ানকে এই মিলের কথা জানায় এবং রিভিউটির সঙ্গে একটি ‘এডিটর্স নোট’ যুক্ত করে। সেখানে এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করে গার্ডিয়ানের মূল লেখার লিঙ্ক দিয়ে দেওয়া হয়।

নোটটিতে বলা হয়, ‘একজন পাঠক সম্প্রতি টাইমসকে সতর্ক করেছেন— এই রিভিউটিতে এমন কিছু ভাষা ও তথ্য রয়েছে, যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। আমরা এই লেখার লেখকের সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি একজন ফ্রিল্যান্স রিভিউয়ার। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, একটি এআই টুল ব্যবহার করেছিলেন যা গার্ডিয়ানের পর্যালোচনার অংশবিশেষ তার খসড়াতে যুক্ত করে দিয়েছিল, যা তিনি শনাক্ত করতে এবং বাদ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার এআই-এর ওপর নির্ভরশীলতা এবং অন্য লেখকের কাজ কৃতিত্ব না দিয়ে ব্যবহার করা টাইমসের সম্পাদকীয় নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর প্রেস্টন গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি নিজেকে ‘চরম লজ্জিত’ এবং বিষয়টি একটি ‘গুরুতর ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি ক্রিস্টোবেল কেন্ট ও গার্ডিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছেও নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন।

প্রেস্টন তার বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি আমার লেখা একটি খসড়া রিভিউতে এআই টুল ব্যবহার করে একটি গুরুতর ভুল করেছি। এআই অন্য একটি রিভিউ থেকে যে অংশগুলো সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তা আমি শনাক্ত করে মুছে ফেলতে পারিনি। তার জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জিত এবং আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমি তাৎক্ষণিকভাবে দায় স্বীকার করে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। সেইসঙ্গে ক্রিস্টোবেল কেন্ট এবং গার্ডিয়ানের কাছেও ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে হাফ ডজন রিভিউ লেখা এই ফ্রিল্যান্সারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

মজার বিষয় হলো, সাংবাদিকতার বাইরে অ্যালেক্স প্রেস্টন একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ম্যান গ্রুপ’-এর পরামর্শক প্রধান। কাকতালীয়ভাবে, চলতি বছরের শুরুতেই তিনি এআই-এর ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন।

কিন্তু নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেই সেই ঝুঁকির ফাঁদে পা দিয়ে তিনি এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। এই ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের ক্যারিয়ারেই প্রভাব ফেলেনি, বরং সংবাদকক্ষগুলোতে এআইর ব্যবহারের সীমা কতটুকু হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার পথ খুলে দিয়েছে।